ধারাবাহিক উপন্যাস “ধারাপাত”( পর্ব -১৭) লেখক,সামসুল হক

18361051_1904283956518216_458912072_nগতানুগতিকের থেকে একটু অন্যরকম সৌন্দর্য বরাবরই অধিক মাত্রায় আকর্ষণ করে সূর্য্যকে। আর সেই জন্যই স্বাভাবিকের থেকে একটু আলাদা আনিশার মন-হৃদয় ছোঁয়ার এত আকুতি। মানুষের জীবনের সব অপেক্ষার হয়তো শেষ হয় না। সবার জীবনের সব আকাঙ্খা হয়তো পূর্ণও হয় না। তবে চেষ্টা করে না পাওয়ার মধ্যে হতাশার সাথে সান্তনাও থাকে । কাল কি হবে কেউ জানে না — সূর্য্যও জানে না আগামীকাল আনিশা কি রূপ নিয়ে আবির্ভূতা  হবে তার মনের আকাশে। সে কি তার হৃদয়ের সৌন্দর্যালোকে ধুইয়ে দেবে সূর্য্যর মন-হৃদয়-শরীর ?  এই শুভ বিদায়ী বর্ষাতে সে কি সূর্য্যর জীবনে শুভ সৃষ্টির বীজ বপন করবে তার সবুজ-কোমল হাতে ? আগামীকাল যে ঘটনায় ঘটুক না কেন মনের গভীরের জ্বলন-পোড়ন একটা নির্দিষ্ট দিক পাবে সূর্য্যর । ইতিবাচক-নেতিবাচক কত ভাবনা, কত কল্পনা যে মাথার ভিতর ভিড় করছে এসে। আজ কি ঘড়ির কাঁটা ধীর হয়ে গেছে ? আজ বুঝি দিনটা বেশ বড়ো হয়ে গেছে । আগামীকাল আসতে বুঝি অনেক দেরি আছে। দিন যদি বা শেষ হল ঘুম আসে না রাতে । আজ দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে সূর্য্যর মানসপটে। আজ রাতে ঘুম বুঝি হারিয়ে গেছে অজানা কোন দেশে। বর্ষা-মুখর রাত, রুমমেট আজ বারোটার আগেই ঘুমিয়ে গেছে । ছেলেটার মানবিক অনুভূতি গুলো সত্যিই খুব কম। বিছানায় পড়লে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে যায়। একদিক থেকে ভাল,  এই ধরনের মানুষ সুখী জীব। সূর্য্যর আজকের রাত হয়তো বিনিদ্রিত কাটবে। খাতা-কলম নিয়ে বসে পড়ে সে । দিনের ঘটনার একটা কথা-চিত্র আঁকার চেষ্টা করে । শেষ পর্যন্ত জন্ম নিল  একটা কবিতা । উত্তর চব্বিশ পরগনার হৃদয়পুর থেকে “দৌড়” পত্রিকা একদিন সেই কবিতা পাঠকের সামনে তুলে ধরে ।

ঊনিশ আগষ্ট 

এগারো মাস যেন কয়েক যুগ —

দূরে—দূরে—

দূরত্বের যন্ত্রণায় নীল মন

অগোছালো-এলোমেলো।

ঊনিশে আগষ্ট চেয়েছিলাম কিছু হোক

আর একটা হিরোসিমা

না হয় সবুজ বিপ্লব।

সমস্ত শক্তি দিয়ে অভিযান

মুখোমুখি—

দেহ-স্বর-জিভ কম্পমান।

আর-এন-টি রোড—

ঊনিশে আগষ্ট  —

আগুনে লেখা ইতিহাস।

=====================

পরের দিন অন্য দিনের মতোই কলেজ শুরু হল।আসার সময় দূর থেকে আনিশাকে শুধু দেখেছিল সূর্য্য।     বিগত এগারো মাস শুধু দেখাদেখি হয়েছে চোখাচোখি বিরলতম।

আজকে ক্লাসে মন লাগে না।আজ পড়া কি মাথায় ঢোকে ? আজকের দিনটা মাইলফলক হবেই জানে তার জীবনের । শুধুমাত্র উপস্থিতি ক্লাসে, মন আজ কোথায় ডোবে কোথায় ভাসে সে খবরও নেই তার কাছে।  গভীর উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় মাঝে-মাঝে ভারী উঠছে বুকের ভিতর ।একে-একে সব ক্লাস শেষ হল সূর্য্যর।সে জানে প্রতিদিনের মতোই আনিশা ক্লাসের পর বাড়ী ফিরে গেছে। বিদ্যাসাগর কলেজের দ্বিতীয় গেটের দিকে চলেছে সূর্য্য তার রুমমেটের সঙ্গে ।এখন বিদ্যাসাগর কলেজের মেন গেটের সামনের সুচেতনা ছাত্রাবাসে থাকে না সূর্য্য । কেন, তার এক গল্প আছে । এক সমুদ্র ভাবনা মাথায় সাইকেলে উঠল সে । ধীর গতিতে সাইকেল চলছে ।গেট পেরিয়ে ফকির পাড়ার রাস্তায় বাকঁ নিয়েছে, এমন সময়ে পেছন থেকে কেউ ডাক দিল,— ” সূর্য্যদা শোন ••• ।” চেনা কন্ঠস্বর, সেই মেয়েটা যে সব সময় আনিশার সঙ্গেই থাকে।ওরা দুজনেই প্রথম থেকেই আর-টি গার্লস স্কুলের ছাত্রী ও ক্লাসমেট।সাইকেল থামিয়ে পেছন ফিরে দেখে সূর্য্য।হ্যাঁ, সেই মেয়েটা।  বলল, —- “এখানে এসো না ।” তার কাছে গেল সূর্য্য, — “বল   ।”  আনিশা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।    সে নিজে তোমাকে বলতে পারবে না তাই আমি তার কথাগুলোই তোমাকে জানাচ্ছি, মন দিয়ে শোন।আজ যে সিদ্ধান্তই শোনাক না কেন সূর্য্য সর্বোত ভাবেই প্রস্তুত । সে চাই মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ঝুলন্ত এই অবস্থার থেকে মুক্তি । মেয়েটা বলতে শুরু করল,— ” আনিশা তোমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছে না । তবে তার কয়েকটা শর্ত আছে । তার বাড়ীতে বিষয়টা যাতে না জানতে পারে সে ব্যাপারে তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে ।     তোমাকে সে খুব বেশী সময় দিতে পারবে না । কলেজ শেষ হওয়ার পর মাক্সিমাম আধ ঘণ্টা। প্রতিদিন সময় দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়, যেদিন কলেজ আসবে কেবল সেই দিনগুলো ।” সূর্য্য তো যে কোন শর্তই আনিশার কাছে যেতে রাজি । এইটুকুই তার কাছে অনেক পাওনা । মেয়েটা বলল,—- “এসো তোমার জন্য অপেক্ষা করছে দোকানের ভেতর ।”

বিদ্যাসাগর কলেজের পূর্ব দিকের গেটে বেরিয়ে নেতাজী মিষ্টান্ন ভান্ডার । এপাড়ায় আসার পর থেকেই এই দোকানে সকাল-বিকেল টিফিন করে সূর্য্য । সবাই চেনা লোক । ভিতরে গিয়ে দেখে কোনের টেবিলে একটা চেয়ারে বসে আনিশা । আনন্দ-সুখ-তৃপ্তিতে শরীর খুবই হাল্কা বোধ হচ্ছিল সূর্য্যর । তার মানস কন্যাকে আজ খুব কাছের থেকে দেখতে পাবে ।এগারো মাসের প্রতিক্ষার পর আঁধার থেকে আলোতে ফেরা। তার জীবনের এক নতুন আধ্যায় শুরু আজ । সূর্য্য ধীরে-ধীরে এগিয়ে যায়, সঙ্গে আনিশার বান্ধবী । আনিশার সামনের চেয়ারে বসল সে । বসেই সবার জন্য ছানার পায়েস আর বোতলের ঠান্ডা পানীয় অর্ডার দিল । কেউ কাউকে কথা বলতে পারছে না । আবার কেউ কারো চোখে চোখ রাখতেও পারছে না । খাবার এল টেবিলে তিন জনের। নি:শব্দে খাবার শেষ হল । আনিশা বলল এবার বাড়ী ফিরতে হবে । আনিশার বান্ধবী তাদের সঙ্গে সূর্য্যকে কিছু দূর যেতে বলল।উঠার সময় সূর্য্য আনিশাকে একটা কথাই বলল,— “তোমার যাতে অসুবিধা হবে তা যে আমি করব না তোমার মনকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবে।”  আনিশা ও তার বান্ধবীর সাথে সূর্য্য চলল পাশাপাশি । অনেক কথা আছে কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না । কিছুদূর যাওয়ার পর সেখান থেকে সূর্য্যকে ফিরে যেতে বলে আনিশার বান্ধবী । সেখান থেকে যতক্ষণ আনিশা চোখের আড়াল না হল ততক্ষণ সেদিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সূর্য্য ।

সামসুল হক

সামসুল হক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *