“ধারাপাত”–ধারাবাহিক উপন্যাস(পর্ব ৪) লিখেছেন, সামসুল হক।

দেবাদিত্য দেবাংশী

দেবাদিত্য দেবাংশী

সূর্য্যের বাবার ইচ্ছে ছিল এই ছেলেটাকে তিনি ডাক্তার করবেন । তাই তিনি তাঁর ইচ্ছেটাকে সূর্য্যর মধ্যে সঞ্চারিত করার চেষ্টা করতে লাগলেন শুধু কথাটা তার কানের কাছে মাঝে-মাঝে বলার মধ্য দিয়ে । সূর্য্য তখনও শৈশব কাটিয়ে উঠতেই পারে নি । তার এই সব কথা ভাবার বা বোঝার মতো চিন্তা শক্তি তৈরী হয়নি তখনও । সমবয়সীর থেকে কম বয়সী ছেলেদের সাথেই তার মেলামেশা বেশি ছিল । শৈশব-কৈশোর কাটিয়ে উঠতে সাধারণের থেকে একটু বেশী সময় লেগেছিল তার । সূর্য্যর বাবা তার ছেলেকে ডাক্তার করার ইচ্ছেটা শুধু করতেন হয়তো । পরবর্তী ভাবনাগুলো তাঁর মনে ছিলই না বলা যায় । কারণ বাস্তব কাজের মধ্যে তার কোন প্রতিফলন দেখা যায়নি কখনো । কোন ইচ্ছেকে বাস্তব রূপদান করতে হলে সঠিক পরিকল্পনা চাই । উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। তারপর সময়ের সদ্ব্যবহার ক’রে কার্যকালের অপেক্ষা করতে হয় । তবেই আসে সাফল্য — অভীষ্ট ফল প্রাপ্তির সুখ ।

সূর্য্যর বাবার সারা বছরের দিনপঞ্জী একই রকম ছিল । সকালে উঠে চাষের বলদ দুটোর সেবায় লেগে যেতেন । খুব যত্ন করে তাদের খাওয়াতেন । সময় মতো গা মুছিয়ে দিতেন, স্নান করাতেন । সকাল  ৭ টা থেকে  ৯ টা পর্যন্ত সারা দিনের খাবার খড় কেটে রাখতেন । সকালের ভাতের গরম ফ্যানে বলদ দুটোর সারা দিনের প্রয়োজনীয় খাবারের খোল ভিজিয়ে দিতেন । সেই দিয়ে সূর্য্যর মা বলদ দুটোকে সারাদিন খাওয়াতেন । স্নান সেরে সাড়ে নটা পৌনে দশটায় সূর্য্যর বাবা গরম-গরম ভাত খেয়ে দশ কি কুড়ি মিনিট গা-গড়িয়ে নিতেন । তারপর বাই-সাইকেল  নিয়ে স্কুলে চলে যেতেন । বাড়ি ফিরে আসতেন সন্ধ্যা লাগার ঠিক আগে । এসে স্কুলের পোশাক খুলে মুখ-হাত ধুয়ে বলদ দুটোকে গোয়ালে বেঁধে তাদের রাতের থাকার খাবারের সুব্যবস্থা ক’রে গোয়াল বন্ধ করতেন । তারপর চা খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়েন  । গল্প-গুজব ক’রে রাত নটা থেকে দশটার মধ্যে ফিরতেন । রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়তেন । সকালে স্কুল থাকলে বেলা বারোটা থেকে সাড়ে বারোটা নাগাদ ফিরে টিফিন ক’রে বলদের সেবায় লেগে যেতেন । স্নান-খাওয়ার পর ভাত-ঘুম দিয়ে বিকেল হলেই বেরিয়ে পড়েন । ফিরতেন সেই সন্ধ্যায় । বলদ দুটোকে গোয়ালে সুব্যবস্থায় বেঁধে আবার বেরিয়ে যেতেন । ফিরতেন সেই রাতে ।
গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষকের কাজে যোগ দেওয়ার আগে পর্যন্ত সূর্য্যর বাবা চৌদ্দ বছর গৃহ-শিক্ষকতার কাজ করেছেন । আশে-পাশের দু-তিনটে গ্রামে সকাল-সন্ধ্যা দু’বেলা ব্যাচ ক’রে পড়াতেন । শরীর খারাপ না হলে কোন দিন বাড়িতে বসে সময় কাটাতেন না । দূর-দূর গ্রাম থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়তে আসতো । এই রোজগারে সেই যুগে আড়াই-তিন বিঘে জমিও কিনেছিলেন । তিনি সত্যিই এলাকার বাঘা শিক্ষক ছিলেন । পঞ্চম শ্রেণি থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পর্যন্ত সকল বিষয় পড়াতেন সমান দক্ষতায় । এলাকার শিক্ষক কূল তিনাকে যথেষ্ট সমীহ করতেন । কারণ স্কুল-কলেজের গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যা তিনি পড়েছিলেন, শিখেছিলেন, জেনেছিলেন ও বুঝেছিলেন সত্যিই তা ছিল নির্ভেজাল । তিনার চৌদ্দ বছর গৃহ-শিক্ষকতার জীবনে মাত্র দুই জন ছাত্র বোর্ড পরীক্ষায় ফেল ক’রে । গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর তিনি গুমতার সংস্কৃত টোল থেকে কাব্য-তীর্থ পড়েছিলেন । বাংলা-ইংরেজী-সংস্কৃত ভাষায় সৃজনশীল লেখার ক্ষমতারও অধিকারী ছিলেন । কিন্তু কোন উৎসব-অনুষ্ঠান ছাড়া সেই প্রতিভার চর্চাও তিনি করেন নি । আজও তিনার মহরম উপলক্ষে লেখা শোক গীতি গুলো যে কোন মানুষের চোখে জল আনতে পারে  । শব্দ চয়ন ছন্দ ও সুর-মুর্ছনায় মানুষের হৃদয় বিগলিত হয় । এই মানুষটি পার্থিব ও বস্তু জগৎ সম্পর্কে খুবই অজ্ঞ ছিলেন । চৌদ্দ বছরের অনুভবী এমন একজন শিক্ষকের ছাত্র ছাত্রীদের লেখাপড়া শেখার সমস্ত দুর্বলতার দিকগুলো জানা আছে আমরা ধরে নেব । তিনি তার নিজের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে কোনদিনই কোন রকম উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি । নিজে বসে থেকে ছেলে-মেয়েদের যেমন পড়াতেন না তেমনি কোন গৃহ-শিক্ষক ও দেন নি । মানুষের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টাতে তিনি উদাসীন ছিলেন । তিনার মন্তব্য ছিল, তিনি থাকতে স্কুলের  বাইরে অন্য কারও কাছে যাবে কেন । ছেলে-মেয়েদের উনাকে ডেকে জেনে নিতে হবে । ছেলে-মেয়েরা একেবারে চেষ্টা করেনি তাও নয় । প্রথমতঃ খুব রাশভারী মানুষ ছিলেন । দ্বিতীয়তঃ কিছু জেনে বুঝে নিতে চাইলে তিনি সেদিন সেটা বুঝিয়ে দেওয়া ছাড়া প্রধানত তাকে বুঝিয়ে দিতেন যে, সে কত কিছু জানেনা এবং সেই ক্লাসের উপযুক্ত যোগ্যতা নেই তার । এই রকম কিছু সময় কাটানো যে কোন ছাত্র-ছাত্রীর জন্য খুবই মানসিক চাপের । আবার সেই শিক্ষক যদি তার নিজের বাবা হয় তাহলে আরও অতিরিক্ত চাপের । এই ভাবে সূর্য্য ও তার দিদি-দাদা-ভাই সবার সাথে তাদের বাবার একটা অলঙ্ঘ্য দূরত্ব সৃষ্টি হয় । পিতা-মাতার সাথে এই দূরত্ব সন্তানদের মধ্যে কখনই কাম্য নয় । মানসিক এই দূরত্ব বড়োই কষ্টের যা কখনো সুফল দেয় না । ভুলটা ভুলই — কর্তা যেই হোক না কেন । যে আমার ভুলটা দেখিয়ে দেয়, ধরিয়ে দেয় সে প্রকৃতই উপকারী । কারও ভুল দেখিয়ে দেওয়া তাকে অসম্মানিত করা কখনই নয় । দু’এক জন দুর্জনের চরিত্র দিয়ে সবাইকে বিচার করা উচিত নয় । এক জনের ভুল থেকে অনেক মানুষ শিক্ষা নেয় — তাতে মানুষের,  সমাজের উপকার হয় । সূর্য্যর বাবার জীবনের এই ঘটনা থেকে যদি পৃথিবীর কোনও একজন বাবা শিক্ষা গ্রহণ করেন সেটাই অনেক প্রাপ্তি ।

লেখাপড়া শেখার মানসিক-পারিবারিক এবং সামাজিক কোন পরিবেশই সর্বতো ভাবে উপযুক্ত ছিল না সূর্য্যর । তবুও সে তার ভিতরের কোন একটা তাগিদে নিজের ইচ্ছে মতো লেখাপড়া চালিয়ে গেছে । তাগিদটা খুব গম্ভীর কিছু ছিল না । তার মনের ছোটো দুটো ধারনা মাত্র । তার ধারনা ছিল যে, মানুষ যতদিন বড়ো না হয় ততদিন তাকে বিভিন্ন স্কুলে পড়তে হয় । আর দ্বিতীয় ভাবনাটা ছিল, প্রতিদিন প্রত্যেক ক্লাসের পড়া তৈরী ক’রে যাওয়া খুবই দরকার । তা নাহলে তার বাবার অসম্মান হবে । কারণ সব শিক্ষক মহাশয় তার বাবাকে খুব ভালো ভাবে চেনে ও জানে । প্রত্যেক বিষয়ের পড়া যেমন সে তৈরী ক’রে যেত তেমনি প্রত্যেক ক্লাসে শিক্ষক মহাশয়দের পড়ানো খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনতো । ক্লাসে শুনেই তার অর্ধেক পড়া তৈরী হয়ে যেত । ক্লাসের পড়া তৈরী করা ছাড়া লেখাপড়া নিয়ে সে আর কিছুই ভাবতো না । আর তাকে অতিরিক্ত কিছু ভাবানোর মতো কেউ পাশেও ছিল না । ক্লাসে পরীক্ষায় কোন পজিশন পেতে হবে এই ভাবনা তার মনে কোনদিনই আসতো না । আর এই ভাবনাটা তাকে ভাবানোর মতো কেউ ছিল না । যদি সে নিজে ভাবতে পারতো বা কেউ তাকে ভাবাতো তাহলে অবশ্যই সে প্রতি ক্লাসে প্রথমই হতো । ক্লাসে তার পজিশন দ্বিতীয়-তৃতীয়তে ঘোরাফেরা ক’রতো । কোনও ক্লাসে প্রথম হতে পারেনি সে । নবম শ্রেণীর অর্ধ-বাৎসরিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও বাৎসরিক পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ে সূর্য্য । নবম থেকে দশম শ্রেণীতে উঠার বাৎসরিক পরীক্ষায় সে পঞ্চম স্থানে চলে যায় । এর থেকে ভালো করার অবস্থা কি ছিল তার ?

কম বয়সী শিক্ষর্থীদের মধ্যে অনেক রকমের দূর্বলতা থাকে । শিক্ষার কোন্ বিষয় বস্তুর উপর কতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার তা সঠিক ভাবে না বোঝা ; পরীক্ষার আগে পরীক্ষা নির্ভর পড়াশুনা কেমন হওয়া উচিৎ তা না জানা ; কোন প্রশ্নের আদর্শ উত্তর কেমন হবে তা বুঝতে না পারা ; পরীক্ষার হলে টাইম ম্যানেজমেন্ট না জানা ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা । এই সব সমস্যা সূর্য্যর ক্ষেত্রে খুব প্রকট রূপেই ছিল । মাঝে-মাঝে স্কুলের বাইরে একটু দুর্বোধ্য বিষয় গুলোর অতিরিক্ত টিউটর অনুভব করতো সে । কিন্তু কোনদিন কাউকে বলতে পারেনি । ক্লাসমেটরা ভাবতো এবং মাঝে-মাঝে বলতোও যে, তার বাবা তাকে নিশ্চয় খুব যত্ন ক’রে পড়িয়ে দেন বাড়ীতে । কিন্তু ভিতরের মার-প্যাঁচ সেই গোবিন্দই জানতো । সূর্য্য চুপ ক’রে থাকতো, এই কথার কোন উত্তর দিত না, এড়িয়ে যেত ।

জীবন-সময়-লেখাপড়া কোন কিছুরই সঠিক গুরুত্ব বুঝতো না সূর্য্য, বেশ বড়ো বয়স পর্যন্ত । কোন-কোন মানুষের জীবনে এই সমস্যাটা পারিবারিক-সামাজিক বা জৈবিক যে কোন এক বা একাধিক কারণে আসতে পারে । সূর্য্য ছিল মানসিক ভাবে তার জীবন পথের একা পথিক । একুশ-বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত তার জাগতিক বয়সের থেকে মানসিক বয়স বেশ কিছুটা কমই ছিল । বাইশ বছরের পরই হঠাৎ ক’রে বড়ো হয়ে যায় সূর্য্য । চিন্তা-ভবনায় স্বকীয়তা আসে তার । আর এরই মাঝে তার জীবন-পথ খুব বড়ো এক বাঁক নিয়ে অন্য পথ ধরে ।

সামসুল হক

সামসুল হক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *