“ধারাপাত”–ধারাবাহিক উপন্যাস(পর্ব ৩) লিখেছেন, সামসুল হক।

18361051_1904283956518216_458912072_nবাৎসরিক পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হওয়ার পরেই সূর্য্য জানতে পারে যে, তাকে আবার গ্রামে ফিরিয়ে আনা হবে । দাদার ট্রান্সফার হয়ে গেছে পুরুলিয়ায় । জানার পর সূর্য্যর মনে খুশীর-আনন্দের-শান্তির বন্যা বয়ে যায় । বাঘের তাড়া খেয়ে পথ হারানো হরিণী যখন অনেক খোঁজা-খুঁজির পর তার বাচ্চাদের কাছে ফিরে আসে তখন সেই মা-হরিণী আর তার বাচ্চারা পরস্পরকে কাছে পেয়ে যে সুখ-শান্তি-তৃপ্তি-খুশির সমুদ্রে ডুবে যায়, ঠিক তেমনি । ঠিক তেমনি সূর্য্যর মন-মস্তিষ্কের অবস্থা । ভাষা দিয়ে সে আনন্দ-খুশী-সুখ বর্ণনা করা সম্ভব নয় ।

সেই সময় রাষ্ট্রীয় সর্বশিক্ষা মিশনও ছিল না আর স্কুলে বা ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে শিক্ষক মহাশয়দের আচরণের রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধ ও ছিল না । তবে সেই সময়ে একটু নামকরা হাই স্কুল হলেই তার ম্যানেজিং কমিটিকে দিয়ে প্রধান শিক্ষক মহাশয় একটা স্থানীয় এলাকা চিহ্নিত করে রেজল্যুশন করে নিতেন । সেই এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে চতুর্থ শ্রেণী পাশ করা সকল ছাত্র-ছাত্রী সেই হাই স্কুলে অবাধে ভর্ত্তি হতে পারতো । সেই স্থানীয় এলাকার স্কুলগুলো ছাড়া অন্য কোন স্কুল থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রী পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণীতে ভর্ত্তি হতে চাইলে তাদের অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে নির্দিষ্ট কোয়ালিফাইং মার্কস পেতে হতো । স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা হলেও সূর্য্য যেহেতু বাইরের স্কুল থেকে এসেছিল তাই ময়ূরেশ্বর হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্ত্তির জন্য তাকে অ্যাডমিশন টেষ্ট দিতে হল । অ্যাডমিশন টেষ্টে প্রথম স্থানাধিকারীর থেকে এক নাম্বার কম পেয়ে দ্বিতীয় হয় সূর্য্য । সে যখন ময়ূরেশ্বর হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্ত্তি হয় তখনও উচ্চ মাধ্যমিক হয়নি স্কুলটি — মাধ্যমিক স্কুল ছিল ।

তখন ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক মহাশয়দের মধ্যে পিতা-পুত্র-কন্যার সম্পর্ক ছিল । ক্লাসে পড়া ক’রে না গেলে বা স্কুলে খারাপ আচরণ করলে শিক্ষক মহাশয়রা যেমন পিতার মতো শাষন করতেন, তেমনি স্কুলের বাইরে কোথাও ছাত্র-ছাত্রীরা খারাপ আচরণ করলেও শিক্ষক মহাশয়রা শাষন করতেন । শাষন যেমন করতেন ভালোও বাসতেন । তখন অধিকাংশ শিক্ষক মহাশয় শিক্ষকতাই করতেন — জীবন-জীবিকার-রোজগারের প্রয়োজনে চাকরী করতে যেতেন না বিদ্যালয়ে । সেই সময়ে তৃতীয় বামফ্রন্ট সরকার সবেমাত্র পথ চলা শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গে । শিক্ষা-স্বাস্থ-কৃষি থেকে শুরু ক’রে দাম্পত্য সম্পর্কের উঠা-পড়া সব কিছুতেই দ্রুত রাজনীতিকরণ চলছে । শ্রমিক শ্রেণী বাক্-স্বাধীনতা ও প্রতিবাদ করার শক্তি পেয়েছে — সামাজিক মুক্তির স্বাদ পেয়েছে । অপ্রত্যাশিত এই স্বাধীনতা-মুক্তির অপব্যবহারও শুরু হয়ে গেছে মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য মতোই । যেমনটি মানুষের আদি পিতা আদমের ক্ষেত্রে ঘটেছিল । স্বর্গের মধ্যে পাওয়া অপ্রত্যাশিত স্বাধীনতা ও মুক্তির অপব্যবহার ক’রে আমাদের আদি পিতা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন । শিক্ষাক্ষেত্র-শিক্ষকদের মধ্যেও রাজনীতিকরণ চলছিল । কম বয়সী শিক্ষকরা অনেকেই এই নতুন রাজনৈতিক শক্তি প্রবাহে গা-ভাসানো শুরু করেছেন । তবে যে কোন কাল, যে কোন পরিবেশেই সংখ্যায় কম হলেও কিছু শিক্ষক থাকেন যিনারা প্রকৃতই শিক্ষকতা করেন ।

তার শিকড়ে লেগে থাকা সেই পুরোনো মাটিতে আবার ফিরে এসেছে সূর্য্য , তার গাঁয়ের, তার মায়ের কোলে । দখিন মাঠের সব্জি ক্ষেতের পবিত্র সুঘ্রান, ফসল ভরা মাঠের সৌন্দর্য, পাখীর বাসা খোঁজার নেশা সবকিছু আগের মতো ফিরে এলো তার জীবনে । সকাল-সন্ধ্যা পড়তে বসে । স্কুলের সময় স্কুলে যায় । বিকেলে দখিন মাঠের, বিল মাঠের সব্জি ক্ষেতের আলে-আলে ঘোরে । বিভিন্ন সব্জি ক্ষেতের যে বিভিন্ন সুগন্ধ বের হয় তার সুঘ্রানে সূর্য্যর নাক-মন-মগজ খুবই তৃপ্তি পায় । এক বছরের বিচ্ছিন্নতার পর আবার সবকিছু ফিরে পেয়ে প্রকৃতির সাথে আরও গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে তার । ছয় মাস সময় কিভাবে যে পেরিয়ে গেল বুঝতে পারে নি সে । কিছু দিন পরই অর্ধ-বাৎসরিক পরীক্ষা । তার লেখা-পড়ার কোন বিশেষ যত্ন বা পরিপাটি ছিল না । গতানুগতিক, আপন খেয়ালে নিজের মতো করে লেখা-পড়া করে সে । পরীক্ষা হয়ে গেল । স্কুল নাই, কিছু দিন মুক্ত মনে ঘুরতে পেল সে । পরীক্ষার ফল প্রকাশ হল । ক্লাসে দ্বিতীয় স্থান পেল সূর্য্য ।

সূর্য্যর বাবার আমলের চার-পাঁচ জন শিক্ষক তখনও ময়ূরেশ্বর হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন । তিনাদের এক জন সূর্য্যর প্রশংসা করতে গিয়ে যে মন্তব্য করলেন তা মনুষ্য সমাজে সঠিক ভাবে প্রযোজ্য বলা যায় না । বাঘের বাচ্চা বাঘই হবে প্রকৃতির নির্দিষ্ট নিয়মে । সিংহের বাচ্চা সিংহই হয় । তবে কোন পন্ডিত মানুষের বাচ্চা যে পন্ডিত হবে অথবা কোন শিল্পী মানুষের বাচ্চা যে শিল্পী হবে এমন কোন নিয়ম-নীতি প্রকৃতি তৈরী করে নি । মানুষ মহাবিশ্বের বিচিত্রতম জীব । বাইরে এক রং আর ভিতরে অন্য রং । দূর থেকে দেখলে এক রকম রূপ আর কাছে গেলে অন্য রূপ । তাই কোন মানুষের জন্য কোন মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলা যায় না । এই মানুষ জীবটা সবচেয়ে বড়ো বহুরূপী । তবে অতি বিরল হলেও সুন্দর-প্রকৃত মানুষ আমাদের মাঝে আছেন । তিনারা মানবিকতা অর্জন করেন এবং সঠিক ভাবে তার অভ্যাসও করেন । তাঁদের অন্তর-বাহিরের একই রং আর সে রং সত্য-সুন্দর-পবিত্রতার । স্বরূপ দর্শন ও উপলব্ধি ক’রে তাঁরা অরূপেলীন।

সামসুল হক

সামসুল হক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *