‘দোল’-ইও কার্যকলাপের ধারা -অনির্বাণ ভট্টাচার্য

Purulia-West-Bengal-Folk-Holiনিশীথরঞ্জন রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অফ ক্যালকাটা টাউন এন্ড সাবআর্বস’ এবং ‘কলিকাতাস্থ তন্তুবণিক জাতি’ গ্রন্থে প্রকাশিত একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি।সেখানে পাওয়া যাচ্ছে “…..১৬৮৮ তে সুতানুটিতে আসিয়া জোব চার্নক প্রমুখ ইংরাজগন গোবিন্দজীউর দোল উৎসব দেখিতে যাইয়া সংঘর্ষ বাধায়।”খবরটির সত্যতা নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও সেই সময়ে দোল উৎসবকে ঘিরে যে কলকাতায় বেশ উদ্দীপনা তৈরি হত,তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।ঘটনাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়।কেননা জানা যাচ্ছে সাবর্ণ চৌধুরীদের এক পূর্বপুরুষ বিদ্যাধর রায় চৌধুরী হালিশহর থেকে কষ্টিপাথরের শ্যামরাই এর মূর্তিটি বরিশাতে(১৭১৬ খ্রি:) নিজেদের জমিদারিতে প্রতিষ্ঠিত করার আগে, এখন যেখানে রাইটার্স বিল্ডিং,সেখানকার কাছারি বাড়ির প্রাঙ্গনে সেই মূর্তিটিকে বসিয়ে রেখেছিলেন।শ্যামরাইকে ঘিরে সারাদিন দোল উৎসব চলত হৈ হৈ করে।সারাদিনের রঙ খেলার পরে বাড়ির নারী পুরুষরা কাছারি সংলগ্ন  দিঘিতে স্নান করতেন।তাদের গায়ের রঙ দিঘির জলে মিশে গেলে,জল লাল হয়ে যেত।অনেকের মতে তার থেকেই নাকি দিঘির নাম হয়,লালদিঘি।একবার একদল গোরা সৈন্য মদ্যপ অবস্থায় ঢুকে পড়ে স্নানের জায়গায়।ঢুকে মহিলাদের প্রতি অশালীন মন্তব্য করতে শুরু করে।শোনা যায়,সেই সময়ে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির পিতামহ,সে যুগের নামকরা লেঠেল জন ফিরিঙ্গি,দলবল নিয়ে ঠেঙিয়ে গোরার দলকে তাড়িয়ে দেয়।লালদিঘি চত্বরে ইংরেজদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করলে রায়চৌধুরীরা শ্যামরাইকে নিয়ে জমিদারি পরিচালনার কেন্দ্র বরিশাতে চলে আসে।পরে সেই পরিবারেরই এক উত্তরপুরুষ সন্তোষ রায়চৌধুরী মাতুলালয় থেকে রাধাকান্তদেবের মূর্তি এনে প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে শুরু হয় খুব জাঁকজমকের সঙ্গে টানা দুদিন ধরে দোল উৎসব।

ভবানীচরন বিরচিত ‘নববাবুবিলাস’ এ আবার দোলকে কেন্দ্র করে ‘বসন্তপুজো’র কথা রয়েছে।’সে বছর মেছোবাজারে বসন্তপূজার হিড়িক পড়ে।নব্য গজিয়ে ওঠা বাবু সম্প্রদায়ের এক প্রতিনিধির কাছে তার বাঁধা রাঁঢ় আবদার করে বলে,ঘরে ঘরে “বসন্তপুজোর ধুম পড়েচে,আমি কি তোমার মেয়েমানুষ হয়ে পরের ঘরে তা দেকে দেকে বেড়াবো?”সেই শুনে উঠতি বাবু নববিবির প্রীত্যর্থ পঞ্চসহস্র মুদ্রা এক বসন্তপুজোয় উৎসর্গ কল্লে।

‘বসন্তপূজার সন্ধ্যায় বাবুরা ফাগ নিয়ে মেতে উঠতেন।চোখে সুর্মা আঁকা,হাতে গন্ধ ভুরভুরে রুমাল,মাথায় রঙীন পাগড়ি দিয়ে চলত এন্তার আবির খেলা।দোল উপলক্ষ্যে গাজিপুর থেকে আসতো গোলাপজল,মুসানগর থেকে আসতো খস।এর সঙ্গে রঙ গুলে কলকাতার বাবুরা মেতে উঠতো দোল খেলায়।এ ব্যাপারে পাথুরিয়াঘাটার খেলাত ভবনের দোলের খুব খ্যাতি ছিল।হুগলীর আদি বাড়ি থেকে কুলদেবতা রাধাদামোদরজীউ কে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন চোরবাগানের শীলবাড়ির আদিপুরুষ রামচাঁদ শীল।এবাড়িতেও দোল উপলক্ষ্যে বিস্তর অর্থ ব্যয় হত।আবির আসতো অধুনা ওপার বাংলার খুলনা থেকে।সারারাত নাচ গানের আসর বসতো।গহরজান,মালকাজান,শেলী,নুরজাহানের মত সেকালের বিখ্যাত গাইয়েরা এসে সারা রাত আসর মাত করে রাখতো।দোল খেলার পরে দলবেঁধে গঙ্গাস্নানে যেত।দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাওয়ালির জমিদারবাড়ির দোলের খ্যাতিও ছিল  খুব।শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেবের দত্তকপুত্র গোপীমোহনের গৃহদেবতা গোবিন্দজীউ ও নিজের পুত্র রাজাকৃষ্ণের গৃহদেবতা গোপীনাথজীউ এর পুজো হত দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে।মধ্যকলকাতার রামদুলাল দে(ছাতুবাবু ও লাটুবাবু) দের বাড়ির গৃহদেবতা শ্রীধরজীউ এর পুজো উপলক্ষ্যে দোলের দিন বহু মানুষের সমাগম হত।

১৮৪০ এর সংবাদপত্রগুলোতে দোলের পরের দিন লেখা হত,”………কলিকাতাস্থ অবাঙালীরা দোল উপলক্ষ্যে অত্যন্ত মদ্যপান করে,আবির দ্বারা রক্তবর্ন হয়,নানান কুৎসিত গান গাইয়া পথে বেড়াইতেছিল।”ইংরাজি কাগজে লেখা হয়েছিল “ব্যাকানেলিয়ান ম্যাডনেস”।অবশ্য এ অভিধা নতুন কিছু নয় বোম্বে(মুম্বাই)এর হোলি দেখে একসময় বাসাম সাহেব একে প্রাচীন গ্রীসের “স্যাটারনালিয়া”বা কামোৎসব এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে অবশ্য খানিকটা ভিন্ন স্বাদের দোলের অনুষ্ঠানের বিবরণ আছে।গুণেন্দ্রনাথ দারুন আসর বসাতেন নিজস্ব বৈঠকখানাতে।ঘর জুড়ে থাকতো সুগন্ধী ফুলের ছড়াছড়ি। মেঝের উপরে আধহাত আবিরের ফরাস পাতা।তার উপরে পাতলা সাদা কাপড় বিছানো।অতিথি অভ্যাগতদের পায়ের পাতার চাপে ফুটে উঠতো রঙবেরঙ এর আলপনা। গোলাপ জলের পিচকিরি মাঝে মাঝেই হাওয়াতে গুঁড়ো গুঁড়ো গোলাপ গন্ধী জলকণা ওড়াতো।অবধারিতভাবেই থাকতো গায়ক,বাজিয়ের দল।প্রায়ই তানপুরা হাতে দেখা যেত অক্ষয় চৌধুরী কে,গায়ক হিসেবে থাকতেন শ্যামসুন্দর।মাঝে মধ্যেই সাদা শ্বেত পাথরের গ্লাসে শীতল সরবত, ডাবের জল,পেতলের রেকাবিতে গোলাপি পেঁড়া,কড় পাকের সন্দেশ নিয়ে হাজির হত আদ্যন্ত সহবৎ শিক্ষায় শিক্ষিত ধোপদুরস্ত পোষাক পরা পরিচারকগন।

কলকাতার দোল নিয়ে মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে পাওয়া যায় “….সেকালে দোলে তত্ত্ব তৈরি করে আদান প্রদানের প্রথা প্রচলিত ছিল।সেই তত্ত্ব পাড়া প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি বিলোনো হত।দোল উপলক্ষে চিনির মুড়কি,মঠ,ফুটকড়াই খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।এছাড়াও আবির,কুমকুম দিয়ে দোল খেলা ছিল খুবই জনপ্রিয়।”রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন যুগের আদলে ঋতুকেন্দ্রিক কয়েকটা উৎসব চালু করেন।যার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘বসন্তোৎসব’।শোনাযায় ১৩১৩ বঙ্গাব্দের ৫ ই ফাল্গুন শ্রীপঞ্চমীর দিনে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্রের আগ্রহে শান্তিনিকেতনে প্রথম দোলউৎসব পালিত হয়।শান্তিদেব ঘোষ মহাশয়ের লেখা থেকে জানা যায়,তিরিশের দশকের প্রথম দিকে গুরুদেব শান্তিনিকেতনে ‘বসন্তোৎসব’ নাম দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বার্ষিক ঋতুভিত্তিক উৎসবটির সূচনা করেন।চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত প্রাঙ্গনে গুরুদেব রচিত বসন্ত ঋতুর উপযোগী গান,আবৃত্তি পরিবেশন করা হত।কখনো কখনো উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের রাগ রাগিণীতে বাঁধা বসন্ত ঋতুর সঙ্গে মানানসই সঙ্গীত পরিবেশন করা হত।ধর্মবাহ্য আনন্দের উৎসব এই দোল।

বসন্তের আবির্ভাবে যেমন প্রকৃতি থেকে শীতের জড়তা কাটে,দেহমনে লাগে মুক্তির দোলা,তেমনই ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিকে ঘিরে গোটা শীত জুড়ে মানুষের দেহ-মনের আড়ষ্টতা,অবসন্নতাকে কাটিয়ে ওঠার যে মুক্তির আহ্বান সঙ্গীতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়,অশোক,শিমূল, পলাশ,শিরীষ,মহুয়া,মাধবী,নাগকেশর,কৃষ্ণচূড়ার বর্ণালীতে জগৎসংসারকে বড় মায়াবী মনে হয়,সেই রঙে হৃদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেহকেও রাঙিয়ে নেওয়ার প্রথাই হল বসন্তোৎসব বা দোল।উত্তর ভারত সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই দোল উপলক্ষে কোথাও ‘হোলি’ বা ‘হোরি’ খেলা অনুষ্ঠিত হয়।পাণিনি রচিত সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ অনুসারে ‘হোলি’ ও ‘হোরি’ শব্দদ্বয় সমার্থক।’র’ ও ‘ল’ এ কোনো প্রভেদ নেই।তবে ‘হোলি’ নামকরণের এবং ‘দোল’ বা ‘দোলযাত্রা’ নামকরণের নেপথ্যের কাহিনী কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।পিছনের গল্প যতই আলাদা হোক না কেন,এটা আজ একটা সর্বভারতীয় রূপ নিয়েছে।সর্বভারতীয় উৎসবের সুরটি কিন্তু ফাল্গুনী পূর্ণিমার এই দিনটিকে ঘিরে এক সম্প্রীতির সুরে বাঁধা।যখন কোনো অনুষ্ঠান সকলের মিলনে সমারোহপূর্ণ ক্রীড়া কৌতুক বা আনন্দের রূপ নেয়,তাকে বলা হয় উৎসব।দোলযাত্রা বা হোলি সেই অর্থে এই মিলনোৎসবের এক সুমহান ঐতিহ্য বহন করে আসছে, পৌরাণিক কাল থেকে।

অনির্বান ভট্টাচার্য

অনির্বান ভট্টাচার্য

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *