“দুর্গা পুজোর পিছু পিছু কালি পুজো ও দীপাবলি”।দেবাশীষ পাইন

2014--kali-pujaদীপাবলি সর্বভারতীয় উৎসব।কালীপুজো, শ্যামাপুজো বলা যায় বাঙালীর শারদোৎসবের এক্সটেনশান।ঘরে ঘরে,দ্বারে দ্বারে, ছাদেতে প্রদীপ, মোমবাতি, ফানুস, তুবড়ি অধুনা চীনা আলোর রোশনাই। বাজির মনোমুগ্ধকর উজ্জ্বলতা। কালিকা মূর্তির ভয়ঙ্কর রুদ্ররূপের সৌন্দর্য। গভীর অমাবস্যায় ঘোর রাত্রিতে মন্দিরে-প্যান্ডেলে দেবীর আরাধনা, ভুত-প্রেত, ডাকিনী-যোগিনী, শ্যামাপোকাদের সঙ্গে ডেডিকেটেড ভক্তদের রাত্রি জাগরণ।এই প্রিয় উৎসবে বাঙালীর মন মা-মা করিয়া ওঠে। পিলে চমকানো বুক ধড়ফড়ানি নিষিদ্ধ শব্দ-বাজির ব্রহ্মনাদ। কোনও কোনও হার্ড কোর ভক্তর উল্লাস, হুল্লোড়, পুলিশের ধরপাকড়। বারুদ-গন্ধ মাখা হাতে ছোটদের মিষ্টি খাওয়া, নিরামিষ বা আমিষ সহযোগে রাতের খাওয়া দাওয়া কিংবা হোটেল-ফোটেলে বুকিং করা টেবিল। ড্রয়িংরুমে মনমাতানো দিশী বা বিদেশী মেনু উইথ বাড়ীর বৌদের দেওয়া ছাড়পত্র সহ পেগের ছড়াছড়ি। সুবোধদের জন্য লিটার লিটার কোক পেপসি – জমে ওঠে বাঙালীর এক্সটেন্ডেড শারোদোৎসব। হঠাৎ হঠাৎ ঢুলীদের ঢাকিদের উচ্চনাদ বাজনার শিল্প-চাতুরী, গভীর মন্ত্র উচ্চারণে ডুব দিয়ে স্তন্যপায়ী থেকে মদ্যপায়ীতে রূপান্তরিত মানুষের গোপনে বা প্রকাশ্যে জলের বোতলে কারণবারি সেবনও চলে এক আনন্দঘন পরিবেশে। কেননা কালী আরাধনায় কারণবারি অ্যালাউড, আর কারুর সঙ্গে থাকে বাবার পেসাদ। মা কালীই বোধহয় একমাত্র জাগ্রত দেবী যাঁর আরাধনা করেন হিন্দু বর্গের প্রায় সকল শ্রেণীর সকল পেশার মানুষ। মাস্তান থেকে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী থেকে ইন্ডাস্ট্রীয়ালিস্ট, উকিল, ডাক্তার-সকলে, পাড়ার ক্লাব থেকে হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিত্ব – অনেকেই হয় পুজোর আয়োজন করেন নয়তো মন্দিরে পুজো দেন। এই আরাধনায় তিনি কতটা যে সন্তুষ্ট হন জানা যায় না, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে তিনি ভীষণ জনপ্রিয়–ভোটে দাঁড়ালে নিঃসন্দেহে সবাইকে ছাপিয়ে যেতেন।

Woman-candles_Reuters

পান্নালালের কণ্ঠে মনমাতানো রামপ্রসাদী গানের ঢেউয়ে ঢেউয়ে মেতে থাকা বাঙালী প্রায় একমাস আগে আকাশপ্রদীপ লাগিয়ে অপেক্ষমাণ থেকে ঘরে ঘরে দীপ জ্বালিয়ে দেন বছরের এই বিশেষ দিনটাতে, মনের সব অন্ধকার দূর করার জন্য। সারাবছর সত্যিকারের মাকে ভুলে থেকে, বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে বছরের একদিন মা মা করা বাঙালী আলোর উৎসবে মেতে ওঠেন ঘরে ঘরে পুজো প্যান্ডেলে।সামগ্রিক ভাবে মহাকালের ধারণা থেকে উৎপত্তি মা কালী চেতনা বাঙালীর নিজস্ব একটি ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা মিথ নির্ভর দার্শনিক অভিপ্রায় যেখান থেকে রামকৃষ্ণের মতন মহতী ধর্মীয় দার্শনিক মানুষ পথ দেখান বহুত্ববাদের “যত মত তত পথ” এই কথা বলে। রামপ্রসাদের মতন অসাধারণ সৃষ্টিশীল কবি-গায়ক মানুষ বলেন পতিত মানব জমিনের কথা যেখানে আবাদ হলে ফলতো সোনা! মাদার কাল্ট-এর এই বহুমুখী চর্চা বিশ শতক অবধি বঙ্গীয় চিন্তকদের অনেককেই আলোড়িত করে। শোনা যায় এক সময়ের পোড় খাওয়া বস্তুবাদীরও মন টলে যায় মা কালী ফিলোসফিতে, বিদেশীরা তো আছেন সে ইতিহাস আমরা জানি। তায়েব মেহেতার সৃষ্টি মা কালী সিরিজের একটি ছবি ভারতের বাইরে শিল্পকলার নিলামে বিপুল পরিমাণ টাকায় হস্তান্তরিত হয়। আশ্চর্য সে ঘটনা! ঋত্বিক ঘটক সারাজীবন ধরে যৌথ নিশ্চেতনা বা কালেকটিভ কনশাসনেস নিয়ে কাজ করেছিলেন, তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি চলচ্চিত্রেই সে কথা উচ্চারিত হয়েছে; সে জন্য লোকে রসিকতা করে বলত- ওঁকে মায়ে খেয়েছে! আজ সেই মা মা করা বাঙালী, প্রতিমা বিসর্জনের পর একটি ছোট সুন্দর ভাইফোঁটা নামক পারিবারিক উৎসবের মধ্য দিয়ে শেষ করেন বছরের পালপার্বণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *