### “জননী” ### লিখেছেন, সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

f8909710e6b799923ef80c34782ad217কুন্তলা বসে আছে অনেক ক্ষণ। তার অপেক্ষার কাল যেন অনন্ত। অনন্ত তার দুর্ভাগ্যও।এখন মাঝে মাঝেই সে স্মৃতি মন্থনে অস্থির হয়ে পরে। নিজেকে নাকি নিয়তিকে প্রশ্ন করে সে  নিজেই জানে না। কেন তার জন্মের সাথে সাথেই তার মা মারা গেলেন?

মাহারা সন্তান তায় আবার কন্যা সন্তান। তার বাবা রাজেন্দ্রবাবু অবহেলা করেন নি। ব্যবসা পত্র সামলে যতোটা সম্ভব মেয়েকে সময় দিয়েছেন মানুষ করতে। আর কুন্তলাও  যেমনি  লক্ষ্মী মেয়ে তেমনি পয়মন্ত। বাবার ব্যবসা তার জন্মের পর থেকেই খুবই সচ্ছল। একটু বড়ো হতেই কুন্তলা শিখে গেছে নিজের কাজ নিজে করতে হয়। এমনকি সর্বক্ষনের কাজের মাসি থাকলেও তার বাবার যত্ন আত্তি ঐ একরত্তি বয়স থেকে  নিজেই করে সে।

বাবাও মেয়েকে মেয়ে নয় মা ভাবে।

আজ ১৫ই মে কুন্তলার ষোল বছরের জন্মদিন। তার বাবা দোলাচলে। মেয়ের জন্মদিন ধুমধাম করেই করেন প্রতি বছর। সাথে স্ত্রী ইন্দ্রাণীর ছবির সামনে দাঁরিয়ে নীরবে কাঁদেন। কথা বলেন। আসলে তাঁর স্ত্রীর বড়ো বাসনা ছিল মেয়েকে অনেক বড়ো মানুষ করবেন। তাই কুন্ঠিত হৃদয়ে জানতে চান স্ত্রী ছবির সামনে “বলনা আমি কি পারছি আমাদের মেয়েকে মানুষ করতে?”

আজ রাজেন্দ্রবাবু খুব ব্যস্ত। তার মেয়ের জন্মদিনে আশীর্বাদ করতে তার বাড়িতে আসছেন গুরুদেব। গুরু পরম্পরায় এই নাথ সম্প্রদায়ের গুরু তাদের কুলগুরু। সুদুর কামাখ্যা থেকে আসছেন। কুন্তলা বাবাকে বললো “কোন চিন্তা করবেনা বাবা, আমি গুরুদেবের  দেখাশোনার কোন  ত্রুটি রাখবোনা।”

গরমের দুপুর গুরুদেব নিদ্রা যাচ্ছেন। ব্যবসার কাজে রাজেন্দ্রবাবু বাইরে। কাজের মাসিটিও বিশ্রাম নিচ্ছেন। একা কুন্তলা জেগে। গুরুদেবের পায়ের কাছে বসে আছে। হঠাৎ গুরুদেব জেগে ওঠেন কিছু বোঝার আগেই কুন্তলা তার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে। ভয়ে লজ্জায় হতচকিত কুন্তলা কাউকে কিছু বলতে পারেনা।

বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল কুন্তলার শরীরটা ভাল যাচ্ছেনা। কাউকে বলতেও পারছেনা। আর বলবেইবা কাকে? বাবাকে?

একদিন কাজের মাসি লক্ষ্য করে কুন্তলা বমি করছে। বাথরুম থেকে ফিরে কুন্তলা চেয়ারে ওপর শরীরটা ছেড়ে দিল। মাসি এগিয়ে এসে কুন্তলার মাথায় হাত রাখল। কুন্তলা আর পারলনা সব কথা  কেঁদে মাসিকে বলে ফেলল। হতভম্ব কাজের মাসিটি আসলে মা হারা মেয়টিকে সে কোন কাল থেকে মানুষ করছে নিজের মেয়ের মতোই। রাজেন্দ্রবাবুকে মাসি সবকথা বললো। ভেঙে পড়লেও ওপরে ওপরে তিনি খুব শক্ত হয়ে রইলেন। তার এক পরিচিত ডাক্তারকে দিয়ে বাড়ীতেই সব ব্যবস্থা করলেন।

রাত প্রায় দুটো এক রত্তি ছেলেটাকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে এল কুন্তলা। আসলে ভাসিয়ে দিয়ে এল মাতৃত্বকে। নিজেকে।

কুন্তলা আজকাল বাড়ির বাইরে যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।  গ্রাজুয়েশান শেষ। তাই কলেজে যাওয়ার প্রয়োজন  নেই। বিশেষ কথাও বলেনা আজকাল কারোর সঙ্গে। রাজেন্দ্রবাবুও  মৃতবৎ বেঁচে আছেন। এর মধ্যেই কুন্তলার জন্য এক বিয়ের সম্বন্ধ আসে। পাত্র ভাল চাকরি করে। যৌথ পরিবার। রাজেন্দ্র বাবু ভাবলেন মেয়ে মা পাবে। পরিবার পাবে।

কুন্তলার বিয়ে হয়েছে প্রায় এরবছর হতে চললো। সে এখনো মা হতে পারেনি। কারন তার স্বামী পান্ডবেস্বর যৌন অক্ষম। কুন্তলা ফুলশয্যার দিনই তা জানতে পারে। তবু এই পরিবারকে সে ভালবাসে। তার শাশুড়ি মুখরা। তবু তাকে অযত্ন করেনা। এক দেওরও আছে।

কিন্তু তার এক মাসতুতো দেওর বিদুরের সাথেই তার সখ্যতা। ক্রমে বিদুর কুন্তলা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

কুন্তলা মা হতে চলেছে। পান্ডবেশ্বর জেনেও নিশ্চুপ থাকে। নিজের অক্ষমতা আর কোন মুখে বলবে! বিদুর জানার পর থেকে আসা যাওয়া কমিয়ে দেয় তবে যোগাযোগ রাখে ফোনে। কুন্তলাও সেটাই চায়।

এর মাঝে এক সন্ধ্যায় গাড়ি এক্সিডেন্টে পান্ডবেশ্বর মারা যায়। শুরু হয় আর এক লড়াই। শাশুড়ি অত্যাচারের মাত্রা বারিয়ে দেয়। দেওরও একদিন শুনিয়ে দেয় বাবাকে খবর দাও তুমি চলে যাও। তোমার আর তোমার আগত সন্তানের দায়িত্ব আমরা নিতে পারবোনা। বাস্তবিক পান্ডবেশ্বরের মৃত্যুর পর তার চাকরির মাইনে সংসারে আসা বন্ধ। সঞ্চিত এবং অফিসের সমস্ত পাওনা  টাকাই শাশুড়ি নিয়েছেন।

সইতে পারছিলনা কুন্তলা। রাজেন্দ্রবাবু এসে নিয়ে গেল তার মেয়েকে। সময়ে যমজ পুত্র সন্তানের জন্ম দিল কুন্তলা।

আজ এতোগুলো বছর চলে গেছে। চলে গেছেন বাবাও। তার সন্তানেরা আজ এগারো বছরের ভালো স্কুলে পড়ে। লড়াই করছে কুন্তলা। বিদুর বন্ধুর মতো সবসময় পাশে থেকেছে। এর বেশী কুন্তলা চায়না। বিদুরেরও সংসার আছে। শশুরবাড়ির কোন সম্পত্তি পায়নি। বাবা যা রেখে গেছেন তাতেই ছেলেগুলোকে মানুষ করে নিতে পারবে।

শুধু পারবেনা তার অতিত মুছে ফেলতে। পারবেনা যাকে হেলায় ত্যাগ করেছিল তারে ফিরে পেতে। কোথায় সেই দুধের সন্তান। কুন্তিরা কি এইভাবেই লজ্জা ঢাকতে যুগে যুগে কর্ণ দের ভাসিয়ে দেবে? সংস্কার লজ্জা  বারবার জিতে যাবে। হেরে যাবে মাতৃত্ব? আর কতদিন কর্ণদের বিনাদোষে আত্মত্যাগ করতে হবে?

শুধু জননী হৃদয় নিজের অপারগতায়  কেঁদে চলে। নীরবে আমৃত্যু।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *