ছোট গল্প : ‘আলোয় ফেরা’-গল্পকার : বিমল কুমার সোম 

screenshot2013-05-02at210306_zpsa86b526fচক্ষু অপারেশন শিবিরে সাত দিনকে সাত বছর মনে হয় বসনের । সেবা, খাবার, ওষুধ সবই ভাল। তবু এক অস্থিরতা তাকে ব্যাকুল ক’রে রেখেছে। ঘনঘন খোঁজ নেয়, পাখিটা কেমন আছে? সে খাচ্ছে কি না ?   খাইয়ে না দিলে খেতে পারবেও না ।বসনের বৌ ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল — পাখি আর পাখি, — এখানেও পাখি ধরবে নাকি ? কিভাবে যে দৃষ্টি ফিরে পাবে তার ঠিক নাই ।

আঁতকে ওঠে বসনের বুক । দৃষ্টি ফিরে পাবে না ?  বিস্ময় জাগে মনে।ডাক্তার আশ্বাস দেন।মাত্র সাতদিন। কিন্তু ষষ্ঠ দিনটা আর যেন পেরোতে চাই না। খুব শিগগির তাকে বাড়ী যেতে হবে।পাখিটার জন্য কাউকে সে বলে আসতে পারেনি।

বসনের কাজ ছিল পাখি ধরা । শুধুমাত্র পাখি ধরা নয়,  পানের বরোজ বাঁধতে যেত । আর সেখানে ফাঁদ পেতে ডাবুক পাখি ধরে আনতো। ডাবুক পাখির মাংস খুব সুস্বাদু।তাই বেশ কদরে বিক্রি হয়।এটা তার একটা উপরি রোজগার।

পাখি ধরার কৌশল হল, বসন বরোজে কাজ শুরু করার আগে খাঁচাসহ পাখিটা একটা জায়গায় রাখত।তার চারপাশে ফাঁদ পেতে দিত।খাঁচার ভেতর থাকত একটা ডাবুক পাখি যার চোখ দুটো সেলাই করা।সেলাই করার কারণ,  একটু দূরে বসন পাখির মত ডাকবে তখন যেন দেখতে না পায় ।

বসন ডাকে পাখির মত ক’রে —- কুরুলাক, কুরুলাক । অন্ধ পাখি বোঝে না সেটা বসনের কারসাজি।সে ভাবে তারই বিজাতীর ডাক।তাই আনন্দে সেও ডাকতে থাকে। তখন অন্য ডাবুক পাখিরা ঝোঁপঝাড় থেকে বেরিয়ে আসে। বসনের ডাক তখন বন্ধ হয়।খাঁচার ভিতরের অন্ধ পাখিটা তখনও ডেকে চলে। সেই ডাকে আকৃষ্ট হয়ে খাঁচার পাখির কাছে তারা যেতে চাই।আর তখনই ফাঁদে আটকা পড়ে।আর যে ফাঁদে আটকা পড়ে পরে তারও হবে অন্ধ দশা।

কয়েক দিন আগে বরোজে কাজ করতে গিয়ে পাখির খাঁচাটা রেখে ফাঁদ পাতার তোড়জোড় করছে বসন । এমন সময়ে হাঠাৎ শুরু হল তার চোখের যন্ত্রণা।পাশের পুকুরে জলের ঝাপটা দিল। কাপড়ের খোঁট দিয়ে মুখের গরম ভাঁপ দিল।কিছুতেই কিছু কাজ হল না।ভাবল কোন পোকামাকড় ঢুকেছে।  চোখটা কচলে নিল। কিন্তু যন্ত্রণা কমছে না।গতিক খারাপ দেখে ফাঁদ গুটিয়ে খাঁচাটা নিয়ে সোজা বাড়ী।তারপর ডাক্তার দেখালো। ডাক্তারবাবু বললেন,  অপারেশন করতে হবে তাছাড়া চোখ রক্ষা করা যাবে না । বসন আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা বলল। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন,  একদিন পর চক্ষু চিকিৎসার ক্যাম্প বসবে। সেখানে অল্প খরচে হয়ে যাবে । বসন রাজি হয়ে যাই ।

ক্যাম্পে শুয়ে বসন ভাবতে থাকে, —- পাখির চোখের সেলাই খুলে আসা হয়নি।তাছাড়া ব্যাপারটা কেউ জানেও না ।বাড়ীতে এই নিষ্ঠুর ব্যাপারটা কে কিভাবে নেবে  — এই ভেবে কোনদিন বলতেও পারেনি ।

সপ্তম দিনে চোখের পটি খুলে দেওয়া হল। ডাক্তার ছুটি দিলেন। বসন তাকিয়ে সাতদিন না দেখা সবকিছুকে প্রাণভরে দেখল । আর ব্যাকুল হয়ে উঠল বাড়ী যাবার জন্য । বাড়ী এল বসন । এসেই পাখিটার খোঁজ করল। বউ পাখিটা এনে বলল — তোমার পাখি আর নেই। বসনের বুকটা ধড়াস ক’রে উঠল।নেই ! তারপর সেলাই করা বন্ধ চোখদুটো দেখে নিজের চোখ বন্ধ ক’রে নিল । সেও চলে গেল অন্ধকারের যুগে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *