গল্প- “রুমাল”, লেখক- শুভদীপ রায়

Sakura-Embroidery-Indian-Silk-Wool-Big-Shawlরিক্সার ভাড়া মিটিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে এল ইন্দ্রাণী৷ দুবছর পর আবার সেই চেনা ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে৷ সবকিছু একইরকম আছে৷ সেই নেমপ্লেট, সেই পলেস্তরা খসা বাড়িঘর, পাশ থেকে ভেসে আসা সেই হাজি বিরিয়ানীর গন্ধ….দুবছরে কিছুই বদলায়নি৷

ইন্দ্রাণী রুমালে কপালের ঘাম মুছল৷ রোদ পড়েছে খুব৷ রাশিয়া থেকে ফিরে গরমটা খুবই অসহ্য লাগছে৷ সানগ্লাসের ফাঁক দিয়ে দোতলার বন্ধ জানলাটী দেখে নিল একবার৷ বড্ড ভারী ভারী লাগছে ইন্দ্রাণীর৷ লাগেজ বা ক্লান্তিতে নয়৷ অনেক দিনের জমে থাকা স্মৃতিগুলো আজ ইন্দ্রাণীকে দেখে ছুটে আসছে৷ বুকে এক অচেনা যন্ত্রণা৷

‘ম্যাডাম, এতদিন পর! ভালো আছেন!’ গৌতমদা একগাল হেসে লাগেজগুলো নিজে নিয়ে ভেতরে চলে গেল৷

ইন্দ্রাণী রিসেপশানে চেক ইন করল৷ ‘ম্যাডাম আপনার অনেকগুলো ফোন কল আর একুশটা চিঠি আছে৷ আমি চিঠিগুলো একটু পরে পাঠিয়ে দিচ্ছি৷’

‘আপনাদের স্যর এসেছিলেন এর মধ্যে?’ একটু সঙ্কোচ নিয়েই প্রশ্নটা করল ইন্দ্রাণী ৷

‘..না ম্যাডাম, শুনেছিলাম উনি অসুস্থ, ওনার বাড়ী থেকে…’ কথা শেষ করতে দিল না ইন্দ্রাণী৷ ‘আমি খুব টায়ার্ড আছি, চিঠিগুলো একটু পরে রুমে পাঠিয়ে দেবেন৷’

‘আচ্ছা ম্যাডাম’, রিসেপশানের ভদ্রলোক ডুপ্লিকেট চাবিটা ইন্দ্রাণীর হাতে দিল৷

সিড়ি দিয়ে ওঠার সময় ওর হাত-পা কাঁপছিল৷ অনেক সময় নিয়েই আজ দোতলায় উঠল ইন্দ্রাণী৷ সত্যি অনেকটা সময় নিয়ে ফেলেছে৷ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল৷ সেই প্রথম দিনের মতোই৷ শুধু এখন আর সেই উত্তেজনা নেই, ক্লান্ত বিধ্বস্ত বড্ড একা৷

অনাথ ইন্দ্রাণী কলেজজীবনে বাংলার অধ্যাপক কল্লোলের প্রেমে পড়েছিল৷  এক দুবার আকর্ষণে কল্লোলও তার এই মেধাবী ছাত্রীটিকে নিজের হৃদয়ের এককোণে লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার চাবিটি অক্লেশে দিয়েছিল৷ তারপর ক্যান্টিন, লেক, পার্ক, লাইব্রেরী পার করে ছাদনাতলা পর্যন্ত সব হিসাব মতোই হ’ল৷

বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী রাজারহাটের এই ফ্ল্যাটে এসে উঠলো, এতে কল্লোলের কলেজ আর ইন্দ্রাণীর অফিস দুটোই কাছে হত৷

অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইন্দ্রাণী যেমন ছিলো কাজে নিষ্ঠাবান তেমনই অ্যাম্বিশাস৷ তাই দ্রুতট প্রচুর উন্নতি, তারপর একদিন আরো বড়ো মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানী থেকে ডাক৷

কল্লোল ওকে সাপোর্টই করত বরাবর, তবু কেন যে যেতে দিতে চাইলো না৷ প্রথমে খুব কাঁদত,তারপর ঝগড়াঝাটি শেষে কল্লোল ফ্ল্যাট ছেড়ে চলেই গেল৷ ইন্দ্রাণীও তার কিছুদিন পর বিদেশে পাড়ি দিল৷

কল্লোলের এই ব্যবহারের কোনো কারণ সেদিন বুঝতে পারেনি ইন্দ্রাণী৷ ভেবেছিল পুরুষ শাসিত সমাজের একরোখা আষ্ফালন; তাই জেদ তাকে আরো বেশী করে পেয়ে বসেছিল৷

দুবছর বিদেশে থাকার পর সে নিজেই আজ ফিরে এসেছে৷ কাজ ছেড়ে কল্লোলকে আঁকড়ে ধরবে বলে৷ কিন্তু সে কি আর ওকে ফিরিয়ে নেবে! কাঁচের ঘসা দাগগুলোতো মোছা যায় না৷

ইন্দ্রাণী রুমাল দিয়ে চোখের জল মোছে৷ এই রুমালটা ওর খুব প্রিয়৷ ইন্দ্রাণীর চিঠির উত্তরে এই রুমালটাই কল্লোল শুধু দিতে পেরেছিল৷ তারপর দুজনের কত হাসিকান্নার সাক্ষী এই রুমাল৷ এখনো এটা ইন্দ্রাণীর সর্বক্ষণের সাথী, ঠিক যেন কল্লোলের অস্তিত্বের জানান দেয়৷

এই দুবছরের অভিজ্ঞতায় সে বুঝেছে, টাকা-পয়সা, নাম-খ্যাতি কিংবা কাজ কোনকিছুই তার কাছে কল্লোলের চেয়ে দামী নয়৷ তার এই মিথ্যা অহঙ্কারের চেয়ে একা থাকার যন্ত্রণা অনেক প্রকট৷ এই একাকীত্ব একমাত্র কল্লোলই মেটাতে পারে৷

ইন্দ্রাণী আশা করেছিল এর মধ্যে কল্লোল আসবে এই ফ্ল্যাটে কিংবা তার কোন খবর নেবে৷ কিন্তু ইন্দ্রাণী এই দুবছরে ওর কোন খবরই পায় নি৷

‘ও আবার বিয়ে করেনি তো! কত মেয়ে যে ঘুরত…’ ইন্দ্রাণী মনে মনে হেসে ওঠে, মনে পড়ে গেল এই চাকরীটার কথা শুনে বাবুর সে কি কান্না!

না আজ সব ভূল বোঝাবুঝি মেটাতে সে নিজেই যাবে কল্লোলের কাছে৷ প্রয়োজনে ক্ষমা চাইবে নিজের অবিবেচনার;  আর সেও এতোটা অবুঝ নয় যে ফিরিয়ে দেবে ইন্দ্রাণীকে৷ সেই অল্পেতে রেগে যাওয়া জেদী ইন্দ্রাণী এতোটা পরিণত হবে ভাবেনি৷

অভিমানের লেশমাত্র না রেখে, ক্লান্তি-শ্রান্তি ভূলে ইন্দ্রাণী কল্লোলের অভিসারে যাবে সেই হারানো দিনের মতো রাগ ভাঙাতে৷ এমন সাতপাঁচ ভাবনার মাঝেই একগোছা চিঠি নিয়ে রিসেপশান থেকে লোক হাজির৷ চিঠির গোছার ওপরেই ‘ওঁ গঙ্গা’ লেখা একটা খাম৷

বুকটা নিজের অজান্তে ছ্যাৎ করে ওঠে ৷ শ্বশুরমশায়ের কিছু হোল না কি মায়ের৷ তাড়াতাড়ি খামটা খুলে দেখার জন্য মনট ব্যাকুল হয়ে পড়ে৷ দরজাটা বন্ধ করে খামটা খুলে কার্ডটা বের করে আনে৷

দুপুরের চড়া রোদে মরা অর্কিডগুলো আরো ভয়ানক মনে হচ্ছে৷ ওর সমস্ত শরীর থেকে মুহুর্তে কেউ যেন সমস্ত প্রাণ শুষে নিল৷ এই মুহুর্তে রুমালটা ওর খুব দরকার৷

টানতে গিয়ে দরজার খাঁজে আটকানো রুমালটা হাতে এলো ইন্দ্রাণীর৷ ঝাপসা চোখে দেখল রুমালের ধার থেকে সুতো আলগা হয়ে যাচ্ছে৷

অভিমানের লেশমাত্র না রেখে, ক্লান্তি-শ্রান্তি ভূলে ইন্দ্রাণী কল্লোলের অভিসারে যাবে সেই হারানো দিনের মতো রাগ ভাঙাতে৷ এমন সাতপাঁচ ভাবনার মাঝেই একগোছা চিঠি নিয়ে রিসেপশান থেকে লোক হাজির৷ চিঠির গোছার ওপরেই ‘ওঁ গঙ্গা’ লেখা একটা খাম৷

বুকটা নিজের অজান্তে ছ্যাৎ করে ওঠে ৷ শ্বশুরমশায়ের কিছু হোল না কি মায়ের৷ তাড়াতাড়ি খামটা খুলে দেখার জন্য মনট ব্যাকুল হয়ে পড়ে৷ দরজাটা বন্ধ করে খামটা খুলে কার্ডটা বের করে আনে৷

দুপুরের চড়া রোদে মরা অর্কিডগুলো আরো ভয়ানক মনে হচ্ছে৷ ওর সমস্ত শরীর থেকে মুহুর্তে কেউ যেন সমস্ত প্রাণ শুষে নিল৷ এই মুহুর্তে রুমালটা ওর খুব দরকার৷

টানতে গিয়ে দরজার খাঁজে আটকানো রুমালটা হাতে এলো ইন্দ্রাণীর৷ ঝাপসা চোখে দেখল রুমালের ধার থেকে সুতো আলগা হয়ে যাচ্ছে৷

শুভদীপ রায়

শুভদীপ রায়

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *