গল্প- “তোমার এ বিশ্বে কিছু হারায় নাকো প্রভু”, লিখেছেন- সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

article-1314131-0355FA1F0000044D-816_468x378“ঘড়িতে কটা বাজে গো আন্টি”?
“উফ্ এই এক জ্বালা প্রতিদিন!”
“বল না গো কটা বাজে?”
“একটাও বাজে না, সব ভালো, যাওতো খেলতে যাও”।
“তুমি বাজে, খুব বাজে,বাবি এলে সব বলে দেবো”।
উপরের কথোপকথন তিতির আর তার আয়া মাসির। তিতিরের মাম্মার রোজ কিটি পার্টি, ডিস্ক, বন্ধুদের সাথে হুল্লোরে ব্যস্ত। অতএব তিতিরের দায়িত্ব তার আন্টি রুপার ওপর। এমনিতে তিতির জন্মানোর পর তার মাম্মা পায়েল সিনহা অনেক কষ্টে তার আগের ফিগার ফিরিয়েছেন। এখন তিতিরের দেখভালের ধকল আর তিনি নিতে নারাজ। রুপা তিতিরকে দেখভাল করে কিন্তু বেচারার বয়স অল্প- প্রেমিক আছে, তার ওপর সিরিয়াল আছে। দুষ্টু তিতিরের জন্য তার প্রায় নাজেহাল দসা।তিতিরের বাবি অনেক টাকা মাইনে দেয়। তাই ছাড়তে পারছেনা।
বেচারা গোলু গোলু দু বেনী বাবির প্রিয় নয়নের মণি তিতির। তার বাবা মানে প্রণবেন্দু সিনহা বিশাল চাকুরে।অগাধ পৈত্রিক সম্পত্তির মালিক। ভালোবেসে পায়েলকে বিয়ে করেছিল। এখন পায়েল তাকে মনে করে টাকার খনি। তিনি বাইরের জগৎ নিয়েই ব্যস্ত, এমনকি একরত্তি মেয়টাকেও যত্ন করেনা।উল্টোদিকে প্রণবেন্দুর পুরোটা দুনিয়া তিতির সোনাকে নিয়ে। সে অফিস থেকে ফিরে আসে ঘড়ি ধরে ঠিক সাতটায়। তারপর তিতিরকে খাওয়ানো, তার সাথে খেলা, গল্প করা, ঘুম পাড়ানো। তারপর হুইস্কির গ্লাস হাতে ব্যালকানিতে দাঁড়িয়ে নিজের মধ্য ডুবে যাওয়া। আসলে কি তাই? হয়তো পুরনো প্রেমে বা পুরনো কাটানো সময়ে ডুবে যাওয়া! দশটার কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে এক সময় বারোটা- একটা, কোন দিন  দুটো বাজে। পায়েলর গাড়ি লনে এসে দাঁড়ায়। টলতে টলতে ও উঠে এসে শুয়ে পড়ে। ঘুমন্ত পায়েলের মুখে আজও প্রণবেন্দু পবিত্রতা খোঁজে। আশ্চর্য হয়ে যায় সে নিজেই নিজের কাছে। আসলে সে এমনি।
প্রণবেন্দু- তুমি এতো নিচে নেমে গেছো?
পায়েল- জানি তোমার থেকে এর বেশী কি আশা করবো আর!
প্রণবেন্দু- তোমার ব্যাগে কন্ডোম, ছিঃ।
পায়েল- এই শোনো ন্যাকামো করোনা। নিজে তো পারোনা। আমি নিজের পিকোসান সব সময় নিজে নিতে পচ্ছন্দ করি।
প্রণবেন্দু- চুপ কর , নোংরা মেয়ে একটা তুমি। একদম চুপ। ঠকিয়েছ তুমি আমায়।
পায়েল- তাই? ঠকিয়েছ তুমি আমাকে। কোন দিন আমায় স্যাটিসফায়েড করোনি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাপ ফণা গুটিয়ে চুপসে যায়।

এরপর আর কথা বাড়াতে প্রণবেন্দুর রুচি হয়নি।মাথা নীচু করে সরে গেছিল। তবে কথাটা সবৈব মিথ্যা। প্রণবেন্দুর শরীর জাগে। উদ্দমতার রেশ আজও টের পায় কিন্তু পায়েলকে ছুঁতে তার ঘেন্না লাগে।

লোকাট ব্লাউজের কাটটা আজ লজ্জাজনক গভীর। ক্লিভেজের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসছে তার অহঙ্কার। রাহুল তাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় পিসে ফেলতে চাইছে। এক টানে খুলে ফেললো তার টপটা। শুষে নিচ্ছে তার জিভ।মুখ রাখলো তার স্তনে। জিভটা নেমে এসে নাভির আবর্তে বুঝি দিসা হারা।
রাহুল দাও। প্রেমের খেলায় যেকোন ওস্তাদ খেলোয়ারও তার কাছে ঘোল খেয়ে যাবে। তার নতুন শিকার বড়োলোকের অতৃপ্ত ওয়াইফ পায়েল। পায়েল শরীরী অতৃপ্ত। আর আছে তার টাকার নেশা। একে হাতছাড়া করবেনা। একবার প্রণবেন্দুর সাথে ডিভোর্সটা করাতে পারলেই পুরো মাল তার। বাচ্চা মেয়েটাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবে নাহয়। ভাবতেই রাহুলের উদ্দামতা বেড়ে গেল চার গুণ।এক চিলতে সুতো নেই কারোর গায়ে। সত্যি পায়েল আজ ঘোটকি। পোক্ত ঘোড়সওয়ার রাহুল চালিয়ে দিল তার ঘোড়া। হঠাৎ খুলে গেল বেডরুমের দরজা। বন্য চিৎকারে ফেটে পড়ল প্রণবেন্দু। উচ্চশিক্ষা, সম্ভ্রান্ত পরিবার, সব ভুলে নোংরা বস্তির ভাষায় যেন নিজেকেই গালি দিতে লাগলো।
“খানকি- বাড়ির বেডরুমে খদ্দের নিয়ে ঢুকেছিস। শুয়োরের বাচ্চা, পরের বউকে ফ্রিতে পেয়ে মজা লুটছিস?
তোকে শালা খুন করে ফেলবো” হাতের সামনে পেল বেলজিয়াম গ্লাসের ফুলদানি। ওটাই ছুড়ে মারলো। খুব বাঁচা বেঁচে গেল দুজনেই। পায়েলর হাতে চোট আর রাহুলের মাথা ফেটে গেল। তবে প্রাণে বেঁচে গেল দুজনেই। এরপর থেকেই দুজন দুজনকে এড়িয়ে চলতে লাগলো। পায়েলও গুম মেরে গেছে।
যত জ্বালা তিতিরের। মাম্মা তবু আগে ভুল করেও একটু আদর করত এখন যেন তাকে দেখেও দেখেনা। বাবি আদর যত্ন করে তবে বাবিকে দেখে তিতিরের এখন কান্না পায়। মনে হয় বাবির খুব শরীর খারাপ। কাল রাতেই তো বাবির চোখে জল দেখেছিল। যাই মাম্মাকে গিয়ে বলি কথাটা। মাম্মা ফোনে কাকে যেন বলছে, ওকে, পারফেক্ট প্ল্যান একদম ওকে। তিতিরের দিকে নজর পড়তেই  হিসহিস করে বলে উঠল ‘ ইউ, জাস্ট হেট আউট ফ্রম মাই সাইট’।

প্রণবেন্দুর চোখটা লেগে এসেছিল। রবিবারের দুপুর। না, আয়েসে নয়, যা যাচ্ছে শরীরের কি দোষ। হঠাৎ তার দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল।ঘোলা চোখে দেখতে থাকল নগ্ন রুপা তার ঠোঁট দুটো গিলে নিচ্ছে। রুপার একটা হাত তার নিম্নে মর্দন করছে। রুপা একি করছে? রুপা তার মাথাটা টেনে নিজের খোলা স্তনের কাছে নিয়ে এল। সে সর্বশক্তি দিয়ে রুপাকে ধাক্কা মেরে ফেল দিল।
কোনমতে চুড়িদারের জামাটা গায়ে জড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে রুপা ঘরে বাইরে এসে পায়েলের ঘরের বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারতে লাগলো। পায়েল বাইরে এসে রুপাকে দেখে হতবাক। ততক্ষণে তাদের দোতলার ডাইনিংএ রাঁধুনি, চাকর, মালি, ড্রাইভার সকলে উপস্থিত।

পায়েল- তুই কাঁদিসনা রুপা। দেখলিতো মানুষটার মাথার ঠিক নেই, আমাকেও তো সেদিন যেভাবে মারলো…….। তবে দেখছি কি করা যায়।
রুপা- কি বলছ বৌদি? আমি আইবুড়ো মেয়ে এরপর আমার কি হবে বলতো? আমি তোমার কোন কথা শুনবোনা এখনি থানায় যাব।
বাড়ির পুরোনো কাজের মাসি আর সহ্য করতে না পেরে বলল “ওরে এই দেবতুল্য মানুষটার তোরা সবাই মিলে সর্বনাশ করতে চাইছিস তো, ধর্মে সইবে না, সবাই মরবি তোরা”।

পায়েল- আঃ কমলাদি তুমি থামবে? কালই তুমি তোমার দেশের বাড়ি চলে যাবে। পাওনা যা আছে নিয়ে যেও।
কাজ চলে যাওয়ার ভয়ে আর কেউ মুখ খুললোনা। তিতির এক কোণে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রণবেন্দু বাইরে বের হতেই বাবিকে জড়িয়ে ধরল। আসলে এই ছোট মেয়েটার খড়কুটো তো একমাত্র তার বাবি।
সিঁড়ির মুখে দৌড়ে গিয়ে পায়েল রুপার হাতে একতাড়া নোট দিয়ে এল “এরপর কি করতে হবে নিশ্চই ভুলিসনি ?”
রুপা- না বৌদি ভুলবো কেন? আসলে আমরাতো গরীব তাই পেট বড়ো বালাই আমাদের ইজ্জত তো বিক্রী হয়, খিন্তু তোমরা বোধহয় বেইজ্জত হয়েই জন্মাও। না হলে ভালোমানুষ বরটাকে এভাবে শেষ করতে পারতে না।
রুপা চলে গেল। প্ল্যান মাফিক বস্তির লোক নিয়ে থানায় গিয়ে এফ আই আর করলো। প্রণবেন্দু গ্রেফতার হল। আদালতে নিখুঁত নাটক করে প্রমাণ করে দিল যে দিনের পর দিন ফাঁকা বাড়িতে প্রণবেন্দু তার সাথে সহবাস করেছে। ইদানিং পায়েলকে খুন করার চেষ্টাও করেছে একাধিক বার।

আদালতের রায়ে পায়েল-প্রণবেন্দুর ডিভোর্স হয়ে গেল। প্রণবেন্দুকে এস্যাইলেমে পাঠানো হল কিন্তু সম্পত্তির কিছুই পায়েল পেলনা। কারণ প্রণবেন্দুর বাবার উইল অনুযায়ী সবটাই পাবে তিতির সিনহা প্রাপ্ত বয়স্ক হলে। আদালত তিতিরের সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিল প্রণবেন্দুদের পারিবারিক এডভোকেট কমলেশ রায়কে। কমলেশ বাবু অনেক চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু প্রণবেন্দু আগাগোড়া চুপ ছিল। তিতিরকে দেখেও কেমন শুন্য দৃষ্টি মেলে চেয়েছিল।পায়েল ঐ বাড়িতেই রাহুলকে নিয়ে থেকে গেল কিন্তু বিয়ে করলো না। বেচারা তিতির। যেন সব দোষ তার। পায়েল আর রাহুল যখন তখন ওর গায়ে হাত তুলতো। কমলেশ বাবু মাসে একবার ঐ বাড়িতে আসতো জমানো সম্পত্তি এবং এম আই এস থেকে প্রাপ্ত  টাকা  সংসার খরচের জন্য দিতে। এরকমই একদিন তিতির তার ওপর হওয়া অত্যাচারের দাগগুলো উকিলদাদুকে দেখিয়েছিল।

প্রণবেন্দু শুয়ে আছে মেন্টাল এস্যাইলেমের ২০৬ নং বেডে। তার মাথায় হাত বোলাচ্ছেন ড. নিসা। পরম মমতায়। বছর ত্রিশের নিশা পরম মমতায় সব রোগীদের সন্তানের মত আগলে রাখে। প্রণবেন্দু উঠে বসল।
“ডঃ তাহলে ওরা যে ভরা আদালতে বললো আমি পাগল, আমি নোংরা। রুপার আর আমার নগ্ন দেহের ছবি ওরা আগে থেকেই লুকোনো ক্যামেরায় তুলে রেখেছিল। ডির্ভোস হয়ে গেল তাতে দুঃখ নেই শুধু তিতির। কান্নায় ভেঙে পড়লো প্রণবেন্দু। ওরা বললো আমি লম্পট। কাজের মেয়েকে সম্ভোগ করেছি দিনের পর দিন। আমি পাগল। নিজের স্ত্রীকে খুন করতে চেয়েছি। আর আপনি বলছেন আমি সম্পুর্ণ সুস্থ। শুধু একটা আঘাত পেয়েছিলাম।”
ডঃনিশা- পুরোনো কথা ভুলে যান প্রণববাবু। তিতিরকে ঘিরে এবার বাঁচতে হবে আপনাকে। আগামী দশ তারিখ কোর্টে ফাইনাল হেয়ারিং।
ডঃ নিশা সেবার ব্রত নিয়ে দুর পাটনা থেকে কলকাতায় এসেছে। প্রণবেন্দুর কেসটা নিয়ে তার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল।বাপ- মা মরা এই মেয়ে বরাবরই কোমল কিন্তু তবু বৌদি তাকে গলগ্রহ ভাবত। তবে দাদার সাথে যোগাযোগ হয় আজও। দাদা তাকে আজও ভালোবাসে। আসলে মনবিঞ্জানের মতে আমরা প্রত্যকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে অসহায়। মরিয়াও বটে। তাই অপরকে আঘাত করে, মেরে নিজেরা এগিয়ে যাই। কমলেশ বাবু যখন প্রণবেন্দুর সাথে দেখা করতে আসত তখন ডঃ নিশা নিজেই তার সাথে আলাপ করে পুরো ঘটনা শোনে। এরপর তিতিরকেও এখানে আনতে বলে। তিতিরের সাথে ভাব জমতে দশ মিনিটই যথেষ্ট ছিল। হাসপাতালের  সুপারের অনুমতি নিয়ে আদালতে প্রণবেন্দুর কেসটা রিওপেন করে।

আজ তিতিরের বাড়ি সব বন্ধুরা এসেছে। কারণ আজ তার বাবা ফিরে এসেছে চিরকালের জন্য। আজ খুব মজা, সবাই আজ খাওয়া দাওয়া করবে। প্রণবেন্দু তার রাজকন্যার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছেনা। তিতির সোনাকে আজ দেবকন্যার মত লাগছে। ডঃ নিশাকে কেন জানিনা একটু অন্যরকম ভালো লাগছে আজকাল। উনি আদালতে আবার এ্যপিল করেন। সব খরচ, পরিশ্রম একা বহন করেন। আদালত রায় দিয়েছে পায়েল স্বৈরাচারিনি, অবিলম্বে পায়েল কে প্রণবেন্দুর বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে  আর রাহুলের সাত বছর কারাবাস, কারণ চাইল্ড এস্যাল্ট।
“সবাই শুনুন” তিতির আবার কি বলছে। “আজ থেকে ডঃ আন্টি আর আন্টি না আমার মম”।
প্রণবেন্দু নিশা দুজনেই তিতিরকে জরিয়ে ধরল।
” তোমার এ বিশ্বে কিছু হারায় নাকো প্রভু” এই গানটাই আমাদের বাঁচার প্রেরণা।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *