“কি লিখি তোমায়”—প্রবাল বন্দোপাধ্যায়

1প্রিয় গোবরাদা,আজ অনেকদিন পর তোমায় চিঠি লিখছি।বড় দুঃখে আছি গো দাদা।এমন দিন যে কখনও আসতে পারে তা স্বপ্নেও ভাবিনি।ক্ষমতা ভোগ করতে করতে ধরেই নিয়েছিলাম আমাদের চেয়ে ক্ষমতাবান বিশ্বসংসারে দ্বিতীয়টি নেই।সেই আমিই আজ শুধু গদিচ্যুতই হইনি,সকলের উপহাসের পাত্র হয়েছি।এখন আমি নখদন্তহীন বাঘ।এই সেদিনও যারা আমায় দেখে ভক্তিতে গদগদ হয়ে প্রনাম করতো আর আমিও হাসি হাসি মুখে গর্বিত ভঙ্গি নিয়ে তাদের আশীর্বাদ বিলোতাম,তারা সকলেই আজ আমায় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।দেখেও দেখে না,চিনেও চেনে না।ভাবটা এমন যেন বুড্ডা তোমার দিন ফুরিয়েছে।এক-একবার ভাবি,যদি কোনভাবে অন্তত একবার,শুধু একবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারতাম, তাহলে সবকটার ওপর জব্বর প্রতিশোধ নিতাম কিন্তু সে ভরসা আজ কোথায়? কখনও একা, কখনও দোকা সবরকমই চেষ্টা করেছি কিন্তু ফল তো সেই অশ্বডিম্ব। ক্ষমতায় ফিরে আসা তো দূরে থাক, ক্ষমতায় ফিরে আসার শেষ আশাটাও যতদিন যাচ্ছে,ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। এই সবকিছুর মুলে ঐ মহিলা, যার কাজকর্ম আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না। না হয় আমরা কিছু ভুল করেইছিলাম, ছোট-বড়-মেজ মিলিয়ে ভুলের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। আর তার জন্য মাঝে মধ্যে দু-চারটে লোকও মরেছে,তাবলে আমাদের যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে নিজে দখল নিয়ে বসবে, এটা কেমনতরো কথা। সে তো অপরাধীই, তাকে যারা সাহায্য করেছিল,তারা আরও বড় অপরাধী। যাকে আমি জামাই আদর করে আমার দেশে নিয়ে এলাম, ক্ষমতা দিলাম, ঐ কুচক্রী মহিলার সঙ্গে মিলে তিনিই কিনা আমাদের নাক কাটলেন। বললেন কিনা আমরা হাড় হিম করা সন্ত্রাস চালাচ্ছি আর শুধু বললেনই না, জনে জনে সেকথা জোর করে বিশ্বাস করিয়ে তবে ছাড়লেন। একবার মনে  হয়েছিল ,উচিৎ শিক্ষা দিই,সকলের সামনে নাক কাটি,কিন্তু ভরসা পেলাম না। যতদিন যাচ্ছে, আমাদের লোকবল এতোটাই কমছে যে মনে হচ্ছে, কাল বাদ পরশু গোটা দলটাই হয়তঃ ইতিহাস হয়ে যাবে। অগত্যা ঠিক করলাম আত্মজীবনী লিখবো। (যদিও জানি আমার আত্মজীবনী খুব বেশী লোক পড়বে  না)সেখানে কাউকে রেয়াত করব না। ঐ কুচক্রী মহিলার মুখোশ তো খুলবোই, তার সঙ্গে তার ধামাধরা ঐ লোকটাকে মোক্ষম জবাব দেব। কিন্তু গোটা ব্যাপারটাই ছানা কেটে গেল। নিন্দুকেরা বলে বেড়াতে লাগল, এতদিন জনগনের মুখঝামটা খাওয়ার ভয় যেসব কথা আমি নাকি প্রকাশ্যে বলতে পারি নি, সেসব কথাই আত্মজীবনীতে লিখে পাতা ভরিয়েছি। এসব কথার কি জবাব হয় বলোদেখি দাদা,আমি সর্বহারা শ্রেণীর নেতা, বোধহয় আজ সব অর্থেই সর্বহারা হতে চলেছি।

যাই হোক, ভালো থেক।এক গামলা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে চিঠিটা আজ এখানেই শেষ করলাম।

ইতি

তোমার অতিপ্রিয়

জনার্দন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *