কাল রাত্রির স্মৃতি–২রা ডিসেম্বর ১৯৮৪,”ভুপাল গ্যাস দুর্ঘটনা”।

bhopal-gas-tragedyতিন দশক আগের মুহূর্তটাকে সিনেমার ‘ফ্রিজ সটের’মতন কে যেন ধরে রেখেছে। কাঠামোটা এখনও এক রকম রয়ে গেছে।প্রশাসনের তরফে মূল ফটক সিল করে দেওয়ার পর ভেতরে ঢুকতে গেলে অনুমতি লাগে।ভেতরে ঢুকলে এখনও কটু গন্ধ নাকে আসে।
ইউনিয়ন কার্বাইডের পরিত্যক্ত কারখানার চৌহদ্দিতে পা রাখলে যে কারও মালুম হতে বাধ্য, মারণ ধোঁয়া মিলিয়ে গেলেও তার আতঙ্কের বিষ কী ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে গোটা শহরটার পরতে পরতে। তিন-তিনটে দশকের সময়স্রোতও তা মুছে ফেলতে পারেনি।

মারণ অভিজ্ঞতার বোঝা প্রতি মহূর্তে টেনে চলেছেন ভোপালবাসী। ভোপাল গ্যাস-কাণ্ড আজ ৩২ বছরে পা দিল।১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর মাঝরাত থেকে ৩ ডিসেম্বর ভোরের মধ্যে মৃত্যুনগরীর চেহারা নিয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত মধ্যপ্রদেশের রাজধানী শহরটি। ইউনিয়ন কার্বাইডের কীটনাশক কারখানা থেকে মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস লিক করে ক’দফায় প্রাণ হারিয়েছিলেন পঁচিশ হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক। মৃত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি তরফে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ভুক্তভোগীদের সংগঠনগুলির অভিযোগ, দুর্গতদের অতি নগণ্য অংশই সরকারি ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। পাশাপাশি অভিযুক্তেরা কেউ সাজা পায়নি।

bhopal-32অর্থ বা বিচার ৩২ বছরে কোনওটাই সে ভাবে না-মেলায় দুর্গতেরা ফুঁসছেন। পরিত্যক্ত কারখানা চত্বরে বিষ-বস্তার স্তূপের মতো নিত্যনতুন বিপদ-সঙ্কেত ক্ষোভের আগুনে ইন্ধন দিচ্ছে। আর এ সবের মধ্যেই তিন দশক আগের এক কালান্তক রাতের মাসুল গুনে চলেছে নতুন প্রজন্ম।

সুুপ্রিম কোর্ট ভোপালের বাইশটি অঞ্চলকে গ্যাস-দুর্গত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। পরে একাধিক বেসরকারি সংস্থা সেখানে সমীক্ষা চালিয়ে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক ও মধ্যপ্রদেশ স্বাস্থ্য দফতরে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই সব তল্লাটে জন্ম নেওয়া শিশুদের অন্তত দশ ভাগ বিবিধ জন্মগত বিকৃতির শিকার। কারও আঙুল নেই, কারও কাটা ঠোঁট, কারও একটা বা দু’টো পা-ই ছোট। কেউ আবার চলচ্ছক্তিহীন। বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, এঁদের অধিকাংশ জিনগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাচ্ছে, যার পিছনে রয়েছে পূবর্বতী প্রজন্মের রক্তে মেশা মারণ রাসায়নিকের প্রভাব। ২০১৪ সালের গোরার দিকে কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের একটি দল ভোপালে এসেছিল।পর্যবেক্ষক দলটি রিপোর্ট ছিল যে “ক্রোমোজোম ভেঙে যাচ্ছে যার ফলে শিশুরা জন্মাচ্ছে নানা অস্বাভাবিকতা নিয়ে।”
অস্বাভাবিকতার বহর যে কতখানি, ভোপালের সরকারি চিকিৎসকদের জিজ্ঞাসা করলেই জানা যাবে।ওঁরা বলছেন, এখন মায়ের দুধের সঙ্গেও শিশুর শরীরে ঢুকছে ক্লোরোফর্ম। ঢুকছে নিকেল-পারদ-সিসার মত ভারী ধাতু। বিষ-গ্যাস কবলিত এলাকার মানুষ যে শাকশব্জি খাচ্ছেন, যে জল পান করছেন, তার মারফত ওঁদের শরীরে এখনও প্রবেশ করছে বিষ। পরিণামে শ্বাসকষ্ট, হরেক চর্মরোগ, নানা অঙ্গে অসাড়তা। মহিলাদের ঋতুচক্রের সমস্যার সঙ্গে ক্যানসার, যক্ষ্মার দাপট বাড়ছে। প্রায় ৩২ বছর আগের গ্যাস লিক জনিত অসুস্থতার জেরে এখনও ফি মাসে ৭-১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।কারখানার পাশের বস্তিগুলোতে গেলে মালুম পাওয়া যাবে কি ভাবে বিষের স্রোত  প্রবাহিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।তিন দশকে বিকলাঙ্গের সংখ্যা হু হু করে বেড়েই চলেছে।

30-1448908177-bhopal-gas-tragedy

শোক-আক্ষেপ-যন্ত্রণা-হাহাকার এসবই ভোপালের আনাচে-কানাচের ছবি। ব্লু মুন কলোনি, চাঁদবাড়ি, নবাব কলোনি, আরিফনগর, সুন্দরনগর সর্বত্র।ভোপালের চর্মরোগ চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা: পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের তিরিশ-চল্লিশ বছর বাদেও নাগাসাকিতে ‘আয়োনাইজিং এফেক্ট’ ছিল। ভোপালেও অতীত বিপর্যয়ের রেশ থেকে গিয়েছে। এ সব তারই ফলশ্রুতি।রাজ্য প্রশাসনের রিলিফ নিয়ে প্রচুর অভিযোগের পাহাড় জমে আছে কিন্তু তার অভিযোগ মানতে নারাজ বরং প্রশাসন সরকারের সাফল্য বর্ণনায় বেশি উৎসাহী। “ক্ষতি তো হয়েইছে। কিন্তু সরকার যে ভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পথ দেখাচ্ছে, সেটাই আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে।”

যদিও প্রশাসনের সাফল্যের দাবিতে বঞ্চনার জ্বালা জুড়োচ্ছে না। গ্যাস-দুর্গতদের কয়েকটি সংগঠন ১৯৮৪ সালের পর থেকে প্রতিবছর এই দিনটাতে সন্ধ্যায় শহরে মোমবাতি-মিছিলের আয়োজন করে। ইকবাল ময়দানে শুরু হয়ে বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে মিছিল শেষ হল ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার সামনে। প্রতিবাদীরা আরও এক বার নীরবে চেয়ে দেখেন তাঁদের দুর্ভাগ্যের উৎসকেন্দ্রকে।৩২ বছর আগের এক কালরাত্রিকে স্মরণ করে আরও এক বার শিউরে উঠলেন অনেকে। এবং ওঁরা সকলে মিলে আরও এক বার শপথ নেয়, সুবিচারলাভের লড়াই থেকে সরবেন না কোনও মতে।

3desh1-1

বর্তমান অবস্তায় কারখানাটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *