‘কাল’ এর কথা আজও –অনির্বাণ ভট্টাচার্য (পর্ব ২)

20cc40265a564c73001432fea2b59080--sacred-feminine-divine-feminineঅনেকের মতে হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রে দশমহাবিদ্যার ধারণাটি এসেছে বৌদ্ধ তন্ত্রের প্রভাবে।বঙ্কিম চন্দ্র লিখছেন “মুণ্ডক উপনিষদে একস্থলে ‘কালী’ ও ‘করালী’ নামের উল্লেখ আছে।”প্রকৃতিবাদ ও শক্তিবাদের এক অদ্ভূত সমন্বয়।বিভিন্ন পুরাণে যত ধরনের কাহিনীই প্রচলিত থাকুকনা কেন,ভারতের প্রায় সর্বত্র তিনি কোথাও চামুণ্ডা,কোথাও দক্ষিণা কালী রূপে পূজিতা।দশমহাবিদ্যার চতুর্থ বিদ্যা হল ‘ভুবনেশ্বরী’।ধ্যাণমন্ত্রে এই দেবী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,দেবী উদিয়মান সূর্যের মত প্রভাময়ী।তাঁর চন্দ্রকিরীট।তিনি উন্নতস্তনী,তিনি ত্রিনয়না, তিনি স্মিতহাস্যমুখী।ভুবনেশ্বরীর সাধনা দ্বারাই সমস্ত বশীভূত করা যায়।’কালচক্র’কে মুষ্ঠিবদ্ধ করা যায়।কুব্জিকা গ্রন্থে বলা হয়েছে ‘ভূবন পালন’ করেন বলে সৃষ্টি স্থিতিকারিনী দেবীই হলেন ভূবনেশ্বরী।ভুবনেশ্বরী প্রকৃতপক্ষে কালীরই এক রূপ।মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে সহদেব ছিলেন ভুবনেশ্বরীর উপাসক।ভরতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে রয়েছে

 রক্তবর্ণা সুভূষণা আসন অম্বুজ

 পাশাঙ্কুশ বরাভয়ে শোভে চতুর্ভূজ

 ত্রিনয়ন অর্ধচন্দ্র ললাটে উজ্জ্বল।

দশমহাবিদ্যার ষষ্ঠবিদ্যা ছিন্নমস্তা।সেই রূপ থেকেই গৃহীত হয়েছে দেবীর দুই পার্শ্ব অনুচর ডাকিনী – যোগিনী। বাঁ দিকে থাকে ডাকিনী আর ডান দিকে থাকে যোগিনী। যাদের অধর প্রান্ত থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্তধারা।আপাত দৃষ্টিতে ভয়াবহ মনে হলেও এই মূর্তি অপার মাতৃস্নেহের প্রতীক।যিনি ক্ষুধায় কাতর সন্তানদের নির্দ্বিধায় রক্ত পান করাতেও পিছপা নন।তাই তো তিনিই মহাকাল।অবিনশ্বর। সৃজন ও ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে চলেছেন।

তবে এই সকল মূর্তি বা প্রতীক তৈরি হয়েছে সাধকের সাধনার সুবিধার্থে।সাধারনের কাছে সহজে সৃষ্টি-স্তিতি-লয় এর ব্যাখ্যার সুবিধার জন্য।কখনো উগ্র,কখনো শান্ত,কখনো সৌম্য,কখনো বেপরোয়া,কখনো সহিষ্ণু, কখনো অসন্তুষ্ট প্রভৃতি বিভিন্ন অভিব্যক্তির ব্যঞ্জনা হিসেবে।তাই সেই অবয়বে আপাত নির্মমতা,আপাত ত্যাগের পরিধান সর্বত্র।

যতীন্দ্রমোহন দত্ত লিখেছেন,দশমহাবিদ্যার মধ্যে বাংলা দেশে কালী ঠাকুরের পুজোর প্রচলনই সবচেয়ে বেশি।মা কালীর একহাতে রয়েছে ধর্ম,আর এক হাতে অর্থ।অন্য দুই হাতে যথাক্রমে কাম ও মোক্ষ।কেউ কেউ বলেন চার হাতে ধরা আছে চারটে বেদ।ঋক,সাম,যজুঃ,অথর্ব।কারণ তন্ত্রের মত বেদ ও অপৌরুষেয়।তান্ত্রিক এবং একইভাবে বেদজ্ঞরাও মনে করেন যতক্ষন পর্যন্ত জীব এবং পরমশিবের একাত্মতা স্থাপিত না হচ্ছে ততক্ষণ বাহ্যপুজোয় কোনো অধিকার জন্মায় না।দেবী কালীর জিভ টকটকে লাল।কারণ,তিনি রক্তবীজ(অসুর)দের গ্রাস করছেন।এখানে আবার অন্য ব্যাখ্যাও আছে।’রক্ত’নারীত্বের(প্রকৃতি)প্রতীক আর ‘বীজ’পুরূষত্বের প্রতীক।এই রক্তবীজের মিশ্রনেই মানুষ।তিনি দাঁত দিয়ে চেপে ধরে আছেন।যাতে রক্ত মাটি না ছোঁয়।কোমরের কাটা হাত গুলো মানুষকে উপলব্ধি করানোর জন্য।এটাই বোঝানো যে জোরটা থাকা উচিত কোমরে।জগতে বেঁচে থাকতে গেলে এই জোর শক্ত হওয়া প্রয়োজন।এটাই অস্তিত্ব আর নিজের ক্ষমতার প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।মা কালী প্রতি মুহুর্তে বিশ্বপ্রসব করে চলেছেন।তাই তিনি এলোকেশী। তাঁর মন সদাই উন্মুক্ত।তাই তিনি দিগম্বরী। সদাই নিজেকে প্রকাশে ইচ্ছুক,তাই উন্মুক্ত-বক্ষা।তাঁর জিভটি ‘খেচরী’ মুদ্রার প্রতীক।যার মাধ্যমে দেবী সৃষ্টির ভারসাম্য রেখে চলেছেন।পায়ের নীচে দেবাদিদেব।এ যেন এক সাধকের প্রতীক।সাধক যখন পরমজ্ঞান লাভ করার দিকে এগিয়ে চলেন,তখন সে ‘শবরূপী’ বাহ্যজ্ঞানরহিত হয়ে যায়।শিব তারই প্রতীক।আর ঠিক তখনই আসে কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান।তাই তো,দেবীর মুণ্ডমালায় ‘অ’থেকে ‘ক্ষ’ পর্যন্ত পঞ্চাশটি বর্ণ থাকে।সেই কারণেই দেবীর অপর নাম ‘বর্ণেশ্বরী’।

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *