“কালী কপালীনি নৃমুন্ডমালীনি”,সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

maxresdefaultকালী কপালীনি নৃমুন্ডমালীনি
শবাসন শ্যামা প্রলয়কারীণি
ভীমা বিবসনা অতীব ভীষণা
লোলরসনা
ত্বং কালী তারীণি দূর্গা, ষোড়শী, ভূবনেশ্বরী
জওয়ালামুখী, ত্বং বগলা, ভৈরবী ছিন্নমস্তা, ত্বং অন্নপূর্ণা, বাগদেবী, ত্বং দেবী কমলালয়া, সর্ব শক্তি স্বরূপা ত্বং সর্ব দেবময়ী তনু।

সতী যেতে চাইছেন বাপের বাড়ী, রাজা দক্ষ শিবহীন যজ্ঞের আয়োজন করেছেন। এই অপমানের জবাব চাইতে সতী চলেছেন বাপেরবাড়ি। ত্রিকালদর্শী মহাদেব আসন্ন বিপদের সঙ্কেত বুঝে সতীকে নিষেধ করছেন যেতে। মহামায়া আদ্যাশক্তি তখন নিজ শক্তি প্রদর্শন করলেন স্বামীর সম্মুখে। দশমহাবিদ্যা রুপ ধরে দেখালেন আদপে তিনি কে। এই দশমহাবিদ্যার প্রথম রুপটি হল মহাকালী।

প্রচন্ড প্রতাপরাশী মৃত্যুরূপীনি দলিতেছে পদতলে এ কেমন কামীনি?……

মায়ের ঘোর কালো বা গাঢ় নীল গাত্র বর্ণ আলুলায়ীতি কেশ রাশি তার ব্যাপ্তি এবং মায়ায় আবদ্ধ জীবনের প্রকাশ।
তার গলার মুন্ডমালা সাধকের বীজ মন্ত্রের রূপক।
কোমরে মুন্ডমালার কোমরবন্ধ জীবের এককেটি পাশ।
মা নগ্নিকা, কারণ এই বিশ্বব্যাপি তার পরীধি এত বস্তের জোগান কে দেবে অন্যথায় তিনি অনন্ত প্রসবীনি।
দাঁত দিয়ে নিজের জিহ্বা কর্তন করে মুখ রক্তাক্ত, কারণ তিনি যেমন বাক সংযমী হতে শিক্ষা দেন একাধারে কাম দমন করতে বলেন।
পদতলে মহাকাল। কালী কালকে দমন করেছেন অন্যথায় সৃষ্টিরুপী শবরুপী শিবকে দমিয়ে রাখছেন।

হেট মুখে চেয়ে দেখ পদতলে ভোলাগো….

অসুরকুলের আক্রমণে সঙ্কটে দেবতারা,স্বর্গরাজ্যের অধিকার নেওয়ার চেষ্টা করছিল অসুররা। অসুরদের নেতা ছিলেন রক্তবীজ | ব্রহ্মার বরে তাঁর একফোঁটা রক্ত থেকে জন্ম নিচ্ছিল আরও হাজার রক্তবীজ | একফোঁটা রক্ত ভূমিতে পড়লেই আবির্ভূত হচ্ছিল তারা,
অসুর নিধন করতে অবতীর্ণ হন দেবী দুর্গা | সব অসুর নিহত হলেও বেঁচে থাকেন রক্তবীজ | কিন্তু সেই যুদ্ধেও ব্রহ্মার বরে অপরাজেয় থাকেন তিনি | এই অবস্থায় দুর্গার ভীষণ ক্রোধে তাঁর দুই ভ্রূ-এর মাঝখান থেকে জন্ম নেন কালী,নগ্নিকা কালীর ভয়াল দৃষ্টিতেই নিহত হন বহু অসুর এরপর দেবীর চিৎকারে প্রাণহানি হয় আরও অনেক অসুরের|

রক্তবর্ণ লকলকে জিভ বের করে কালী গ্রাস করে নেন হাতি ও ঘোড়ায় সওয়ার অসুর বাহিনীকে,দেবী কালী তাঁকে অস্ত্রে বিদ্ধ করে তাঁর সব রক্ত পান করতে থাকেন | রক্তবীজের একফোঁটা রক্তও যাতে ভূমিতে না পড়ে রক্তবীজের দেহ শূন্যে তুলে নেন কালী |এই অবস্থায় রক্তবীজের দেহের সব টুকু রক্ত পান করেন দেবী কালিকা | শেষ বিন্দু রক্ত পান করার পরে নিথর রক্তশূন্য রক্তবীজের দেহ ছুড়ে ফেলে দেন তিনি |আকণ্ঠ রক্ত পান করে বিজয়নৃত্য শুরু করেন কালী | নিহত অসুরদের হাত দিয়ে তিনি কোমরবন্ধনী এবং মাথা দিয়ে মালিকা বানিয়ে পরিধান করেন |

কালীর উন্মাদিনী নৃত্যে আসন্ন হচ্ছিল সৃষ্টির লয় |  দেবতারা শিবের শরণাপন্ন হলেন | তাকে রোখে কার সাধ্যি?শিবের একাধিক মৌখিক অনুরোধ শুনতে পাননি তিনি। কোনও উপায় না দেখে নৃত্যরতা কালীর পায়ের তলায় নিজেকে ছুড়ে দিলেন মহাদেব |
এরপরেই সম্বিত ফেরে কালীর | থেমে যায় নাচ | পায়ের নীচে স্বামীকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটেন তিনি |
বিগ্রহে কালীর ডান পা যদি এগিয়ে থাকে তবে তিনি দক্ষিণা কালী | আর বাঁ পা এগিয়ে থকালে তা মায়ের বামা রূপ |
তিনি সত্ত্ব, রজঃ ও তমো – এই তিন গুণ বিবর্জিতা; তিনিই সকল জীবের রূপে বিরাজমানা বা ‘ক্রীং’ অক্ষররূপা।

কালী, কপালিনী, কুল্লা, কুরুকুল্লা, বিরোধিনী, বিপ্রচিত্তা, উগ্রা, উগ্রপ্রভা, দীপ্তা, নীলা, ঘনা, বলাকা, মাত্রা, মুদ্রা, মৃতা – এই পনেরোজন জ্যোতির্ময়ী দেবী পনেরোটি কোণে বিরাজমান।
সারা দেশে সাধারণত কলকাতা এবং আসামে শক্তী পীঠ হিসাবে পরীচিত। কলকাতার কালী ঘাট, দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারীণি এবং বীরভূমের তারাপিঠের মা তারা, সব এক অঙ্গে বহুরূপ।

সময়তো থাকবেনা গো মা কেবল মা তোর কথা রবে ……..

আমার পরীচিত এবং প্রতিবেশী একপরিবারে বিখাত্য কালীপূজা। কথিত পরিবারের কর্তা ভাই বোন নিয়ে সর্বশান্ত হয়ে বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসেন। কর্তা দ্বীজদাস তখন যুবক, ক্ষুণিবৃত্তি করতে বড়ো বাজারে কখনো মুটে কখনো জলের ভাঁড়ি হিসাবে, কখনো দোকানে কাজ করছেন। একদিন কালীপূজার আগে পরিশ্রান্ত হয়ে হেঁটে কুমারটুলী হয়ে বাড়ি বরানগরে ফিরছেন। পটুয়া পাড়ার কাছে আসতেই এক বালিকা কন্ঠে বারংবার শুনতে পান “নিয়ে চল না, সাথে নিয়ে চল না!” পিছনে ফিরে দেখেন কেউ নেই। আরেকটু এগিয়ে একটি ছোট কালী মূর্তি দেখতে পান। সম্বল যা ছিল তা দিয়ে প্রতিমা কিনে মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরন, সাধ্যমত পূজা করেন। কালে তিনি সম্পদশালী হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর বছরে বাড়ির লোকজন ঠিক করেন সে বছর পূজা করবেন না। পূজার দিন ভোর বেলায় প্রতিবেশী এক সবজী বিক্রেতা স্ত্রী লোক দেখেন একটি কালো কোলো পাঁচ ছয় বছরের বালিকা দ্বিজ বাবুর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে জীজ্ঞাসা করেন কি হয়েছে?
বালিকা- এরা আমায় ঢুকতে দিচ্ছে না।
এমন সময় তিনি অন্যমনস্ক হলেন এবং দেখলেন কেউ নেই। তিনি তাদের সব কথা বলেন। বলা বাহুল্য সে বছর আবার পূজা হয়।

মা আছে আর আমি আছি ভাবনা কি আর আছে আমার…….
কোন এক সময়। বিশেশ এক প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে আর তা না পাওয়ায় আমি হতাশ প্রায় অবসাদগ্রস্থ। তারাপিঠ গিয়েছিলাম। সকালবেলায় নাট মন্দিরে বসে ছিলাম সামনে মা তাঁরা। চোখটা জুড়ে এসেছিল। হঠাৎ কোলের ওপর একটা আঙুর এসে পড়ল। আসে পাশে আঙুর গাছ নেই কেউ খাচ্ছিল ও না। আমি সেটাই আশীর্বাদ হিসাবে গ্রহন করলাম। উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছিল এরপর। আজ ও যা মাথায় করে রেখেছি।
পরিশেষে বলি –
সন্তানে দিতে কোল ছারি সুখ কৈলাশ
জননী শান্তিময়ী শশ্মানে করেনবাস
কি ভয় শশ্মশানে শান্তিতে যেখানে
ঘুমাবি জননীর চরণেরি তলে।
জয় মা।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *