“কলকাতা কলকাতাতেই থেকে গেল”(ধারাবাহিক-৩ পর্ব) হোসেনুর রহমান।

800px-New_market,_calcuttaভারতের সংস্কৃতি কাকে বলে? কয়েকটি লাইনে পণ্ডিত সেন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন-“বহু সভ্যতা ও সংস্কৃতির পলিমাটি দিয়ে স্তরে স্তরে ধীরে ধীরে ভারতের সংস্কৃতিলোকটি গড়ে উঠেছে পাশাপাশি সবাই বসবাস করছে।কেউ কাউকে নির্মূল করেনি।অতি উন্নত ও অতি তত্ত্বজিজ্ঞাসুদের পক্ষে ভারতের মতো এমন উত্তম বিচরণক্ষেত্র আর নেই।পাশাপাশি নানা সংস্কৃতির যোগাযোগ জীবন্ত থাকাতে এদেশে কতরকম সাধনারই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং সেই জন্যই এই দেশের ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্পদ নানা বিচিত্র ঐশ্বর্যে ভরপুর”।

এমন সংস্কৃতির ঐশ্বর্য ভারতবর্ষে কেবল মাত্র এই কলকাতাতেই পাই।কলকাতার বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে,বহু ধনী,বহু দরিদ্র,বহু উচ্চশিক্ষিত,বহু স্বল্পশিক্ষিত নরনারী পাশাপাশি স্বচ্ছন্দে বসবাস করছে।এ এক বিচিত্র শহর যাকে বাদ দিয়ে ভারতবর্ষ অসম্পূর্ণ হয়ে যায়।বাংলা ও বাঙ্গালীকে বাদ দিয়ে ভারতবর্ষ ক্ষিতিমোহন সেনদের হারিয়ে ফেলবে।সেদিন ভারতবর্ষের দৈন্যদশার শেষ থাকবে না।

এই কলেজ স্ট্রিট অর্থাৎ বইপাড়া এক আশ্চর্য জগত।জগতই বলতে হয়।প্রেসিডেন্সি কলেজের গায়ে পুরনো বই না দেখলে হটাত ২০০/৩০০ বছরের পুরনো বই কোথায় পাবেন?নৃ-বিজ্ঞানী গান্ধীবাদী অধ্যাপক নির্মল কুমার বসু এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে অসংখ্য বই কিনতেন।আমার মাস্টারমশাই অধ্যাপক বসু বহু বহু বই কিনে গাড়ীতে তুলে নিয়ে চলে যেতেন।একবার আমি বই কিনে টাকা দিতে গেলাম,গেন্দু বললে আপনাকে টাকা দিতে হবে না।আপনার যা নেবার নিয়ে নিন।আমি কাল সকালে বোসপাড়া লেনে গিয়ে আপনার বইয়ের দাম বড়বাবুর কাছ থেকে নিয়ে আসব।আমি অবাক হয়ে তাকাতে গেন্দু বললে বড়বাবু তাই বলে গেলেন।এই পুরনো বইয়ের দোকানের মালিকদের আর একদিন এক বিস্ময়কর দৃশ্যে দেখেছিলাম।মাস্টারমশাই পার্কভিউ নার্সিংহোমে মারা গেলেন।তার কিছুক্ষণ পরে পুরনো দোকানের মালিকেরা নার্সিংহোমে এল।এবং নার্সিংহোমের কতৃপক্ষকে তারা বললে আমরা একবার বড়বাবু যে ঘরে ছিলেন সে ঘরটায় যাব।নার্সিংহোমের কতৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে সেই ৯নং ঘরে তাদের নিয়ে গেল।তারা এতটুকু সময় নষ্ট না করে নির্মলবাবুর সেই শূন্যখাটে নামাজ পড়তে আরম্ভ করল।কিছুক্ষণের মধ্যে নামাজ শেষ করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তারা বিদায় নিল।এ কেবল কলকাতায় সম্ভব।

kolkata_photography_26

এই হল কলকাতা।ভারতবর্ষের অন্য কোন মহানগরে এই দৃশ্য দেখতে পাবেন না।এই কলকাতাতে পুরনো বই দেখবেন আবার বিভিন্ন অঞ্চলে(নিউমার্কেটে তো বটেই)গোমাংসের এবং শুকরের মাংসের দোকান দেখতে পাবেন।ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লিতে তো কল্পনাই করা যায় না।না,কলকাতা একমাত্র মহানগর যেখানে ধনী ও দরিদ্র,উচ্চশিক্ষিত ,অল্পশিক্ষিত,অশিক্ষিত সকলেই নিউমার্কেটে বাজার করতে পারে।বিশেষত দুর্গাপুজো,ঈদ ও বড়দিনের সময় এ দৃশ্য আমি দিল্লিতে কিংবা ঢাকায় দেখিনি।আবার আর একটি দৃশ্যের কথা বলি।মেয়েরা কলকাতায় যত স্বাধীন,যত শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ব্যস্ত,এ কি লখনউ-এ দেখতে পাওয়া যাবে।কলকাতার পর নারী শিক্ষা ও স্বাধীনতা দেখতে হলে কেরলে যেতে হবে।কেরলে মুসলমান মহিলা ধর্মপ্রাণ হতে পারেন কিন্তু একই সঙ্গে চূড়ান্ত শিক্ষিত ও স্বাধীনভাবাপন্ন।কেরল কিংবা কলকাতার নারী স্বাধীনতা দেখে জনৈক বন্ধু(ঢাকা থেকে এসেছিলেন)চরম বিস্ময়ে বলেছিলেন এ দৃশ্য ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে কল্পনাই করা যায় না।এই বাংলাদেশী মহিলা পোষাকে পরিচ্ছদে একেবারে আধুনিকা কিন্তু ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে একেবারে প্রাচীনপন্থী।এই প্রাচীনপন্থা এই উপমহাদেশে কিছুতেই লুপ্ত হতে চায় না।অবশ্যই কলকাতাকে বাদ দিতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে এই উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ কি?ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ পরিবর্তন।আমাদের বোঝা উচিৎ ধর্ম যুগে যুগে বদলে এসেছে,আর সংস্কৃতি তো যুগে যুগে সময়ের সঙ্গে বদলে এসেছে।তাহলে আমরা পারছি না কেন।পরিবর্তন ও প্রগতি,রুচি ও বর্তমান এগুলো আমরা বুঝতে পারছি না।আমাদের গভীর অর্থে ইতিহাস ও বিজ্ঞান অনুধাবন করতে হবে।বুঝতে হবে কেন আমরা অতীতে যা ছিলাম তা আজ  নেই। কি পুরুষ কি নারী উভয় ধর্ম ও সমাজকে স্বীকার করে কিংবা না করে নতুন জীবনধারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *