“কলকাতা কলকাতাতেই থেকে গেল”- হোসেনুর রহমান।

20848599583_187b46a013

 

 

 

 

এমন একটি বক্তব্য দিয়ে একটি লেখা আরম্ভ করা বেশ মজার হতে পারে।এই পার্কসার্কাস কলকাতার এক বিশাল অংশ।আজন্ম এই পার্কসার্কাসকে দেখছি।কারন এই অংশের মধ্যেই আমি বাস করি।যখন ৮-১০ বছর বয়েস,তখন বাড়ি থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। আমার মা ছেলেকে নিয়ে যারপরনেই ব্যস্ত থাকতেন।দাদা দিদিরা ইতিমধ্যে এতো বড় হয়ে গেছে যে তাদের আর শাসন করার সময় ছিল না।আর আমার পরের দুই ভাই এতই ছোট ছিল যে তাদের শাসন করার কথাই উঠত না। আমি স্বচ্ছন্দে মা’র শাসন মেনে নিতাম।আর একটা কারন আমাদের দোতলা বাড়িটা আমাদেরই ছিল।বিরাট বারান্দায় আমি রেলগাড়ি চালাতাম।দোকান বসাতাম।আর নেতাজি’র ছবি নিয়ে দিন কেটে যেত।পাশের বাড়ি থেকে আমার বয়সী দুটো ছেলে আসত।আমার সঙ্গে সমস্ত দিন কাটিয়ে দিত।দুপুরে একবার খেতে বাড়ি যেত।প্রায় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আমাদের খেলা চলত।তারপর মায়ের হুকুমে পড়তে বসতে হোত।এভাবে হটাত বছর দুই কেটে গেল।তারপর আমাকে পার্কসার্কাসের এক স্কুলে ভর্তি করা হল।আমি কিছু মুখে না বললেও ইস্কুল একেবারে ভালো লাগত না।ইস্কুল আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি।

কৈশোরের কথা সব ভুলে যেতে পারিনি।এই কৈশোর আর আজকের ছেলেমেয়েদের কৈশোর ভাবলে চমকে উঠতে হয়।আজকের ৮-১০ বছরের ছেলেমেয়েদের এত বড় মনে হয় যে মাঝে মাঝে মনে হয় ছেলেটি বয়স কমিয়ে বলছে নাকি!না,আদৌ না।যথার্থ বয়েসই সে বলছে।হ্যাঁ,এদের একটা বিষয় আমাকে চিন্তিত করেছে।এরা ফুটবল কত খেলে,কত হকি নিয়ে মারামারি করে,এসব বড় একটা চোখে পড়েনি।হ্যাঁ, একটা লাইব্রেরী আছে বৈকি।অবশ্যই বইও আছে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে,এরা জীবন ও জগত নিয়ে কি ভাবে?সময় এত বদলেছে।চারদিকের কাজকর্ম এত বদলেছে যে এরা আর আমাদের কালের সময়কে বোঝে না।

আচ্ছা এরা কি বছরে একবার বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবে,নাকি কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে যায়।তারপর ফিরে এসে জমিয়ে আড্ডায় বসে।আলোচনা করে,কলকাতা থেকে সামান্য দূরে ঐ জায়গাটা অথচ এত আলাদা-এত ভিন্ন।অবাক হয়ে যেতে হয়।ধরা যাক বসিরহাটের শেষ প্রান্তের নদীর পারে দাঁড়িয়ে ওপারে অন্য একটা দেশ দেখা যায়।হ্যাঁ,ওদিকটা নাকি অন্য দেশ।ওরাও অবাক হয়ে এপারের ছেলেমেয়েদের দেখে।এই দেখাশোনা পাসপোর্ট ভিসা নিয়ম না মেনেই স্বচ্ছন্দেই একটা পিকনিকে কিংবা ভারত-বাংলাদেশ আলোচনা সভায় পরিনত হতে পারে।হ্যাঁ,অসুবিধা আছে।সিমান্তের পাহারাদারেরা কি ছেড়ে দেবে।তাদের বোঝাতে পারতে হবে যে আমরা চাল-ডাল নিয়ে নয় দু চারটে বই নিয়ে আড্ডায় বসেছি।ঘণ্টা দু-তিন কাটিয়ে যে যার ঘরে(না বলা উচিৎ ছিল দেশে)ফিরে যাব।হ্যাঁ,আমরা দুটো ভিন্নদেশের অভিন্ন মানুষ।যাই হোক আনন্দের উৎসবে,রবীন্দ্রসঙ্গীতের আড্ডায় কোন অন্য পরিচয় দরকার নেই।সীমান্ত প্রহরীরা যখন বুঝবে এরা পিকনিক পার্টি তখন ওরাও এমন মধুর মিলনমেলায় এসে যোগ দিয়ে ফেলবে।

BSF_Border_Patrol_Winter_PTI_650

এমনি করে দেখা যাবে জিন্নার দ্বি-জাতি তত্ত্ব কত মিথ্যে এক প্রহসন বই আর কিছু নয়।এই মিলনমেলা একবার জমে গেলে প্রতিবছর চলতে থাকবে।দেখা যাবে দু-দেশের ছেলেমেয়েরা আর ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতি খেলা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।মন দিচ্ছে নতুন উপন্যাস,প্রবন্ধের বইয়ের দিকে।ওরাও জানতে চায় আমাদের এদিকের সাহিত্যের খবর।সত্যি এসব বিনিময় হলে দেখা যাবে আমরা দুটো ভাষায় সাহিত্যে,সঙ্গীতে কত আলাদা হয়ে গেছি।একদিন তো একটাই দেশ ছিল।হটাত ১৯৪৭-এ এ কি হোল?এসব জটিল প্রশ্ন নিয়ে আজকের ছেলেরা কিছুই ভাবছে না।তারা ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব,সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করতে উদ্যত।যে ভাগ হয়েছে ১৯৪৭-এ সেতো হয়েই গেছে।আজকের কথা আজকেই ভাবা যাক।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীকে কি যেন বলে বিদ্রূপ করলেন তাতে এই যুবকদের কিছুই এসে গেল না।কারন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে এরা কিছুই মনে করে না।সেই তুলনায় আমাদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এত বড় অর্থনীতিবিদ,চিন্তাবিদ,শিক্ষাবিদ ছিলেন যে পাক-প্রেসিডেন্ট কখনই ঐ উচ্চতায় যেতে পারবেন না।আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পাক শিক্ষা-সংস্কৃতির এতটাই দূরত্ব। এতটাই পার্থক্য যে আমরা হতবাক হয়ে যাই।এমন হল কি করে?এমন হওয়ার কারন পাকিস্তান একটি ধর্মপ্রধান রাষ্ট্র।পাকিস্তানে কিছু হিন্দু,খ্রিষ্টান,বৌদ্ধ সেদেশে আছে এই পর্যন্ত।তারা তাদের প্রান ও মর্যাদা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কোন মতে বেঁচে আছে।টিকে আছে বলা ভালো।এই অন্ধকার জগতটি আলোচিত হবে সেদিন যেদিন সঙ্গীত,চিত্রকলা,চলচ্চিত্র এবং অবশ্যই সাহিত্য অন্য সবকিছুকে ছাড়িয়ে উঠবে।তার সঙ্গে খেলাধুলা তো আছেই।এই খেলাধুলায় মেয়েরাও ছেলেদের সঙ্গে সমান অর্থে অংশগ্রহন করবে।অর্থাৎ মেয়ে যেমন ডাক্তার হতে পারে,ছবি আঁকতে পারে,হাইকোর্টে উকিলের কাজ পুরুষের সঙ্গে সমানহারে করতে পারে,ভারতদর্শনে আসতে পারে।

**পরের অংশ ক্রমশ প্রকাশ হবে।লেখাটি পড়তে চোখ রাখুন একবিংশ’র পাতায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *