‘একুশের গানের নেপথ্যে’ -অনির্বাণ ভট্টাচার্য

2010-02-19-18-05-59-092508700-jagoron“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”গানটি লিখেছিলেন আবদুল গফফর চৌধুরী। সুর দিয়েছিলেন আলতাফ মাহমুদ।গানটির মধ্যে দিয়ে ১৯৫২ র একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের চৌহদ্দিতে ঘটে যাওয়া নারকীয় গণহত্যার এক করুণ কাহিনী ধরা পড়েছে।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মানুষ ছিলেন, লেখক ও সাংবাদিক আবদুল গফফর চৌধুরী।১৯৫২ র ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে দশ জনের এক একটি ছোট ছোট দল যখন এগোচ্ছিল তখন আর একদল  ছাত্র মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের উত্তর পূর্ব দিকের অর্থাৎ যাতায়াতের প্রধান গেট সংলগ্ন ব্যারাক তথা বারো নম্বর শেডের কাছে সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছিল।কেননা এটা ছিল পরিষদ ভবনের সবচেয়ে কাছে অবস্থিত।ছাত্রদের মধ্যে ‘সত্যাগ্রহ’জাতীয় আন্দোলনের ইচ্ছে মোটেই ছিল না।দশজনী মিছিলের প্রথম দিকে নেতৃস্থানীয় কারো কারো গ্রেফতারের কথা ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তেই ছাত্ররা সঙ্ঘবদ্ধভাবে ১৪৪ ধারা ভাঙতে এগিয়ে আসে।ইতিমধ্যে পুলিশও তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে।উদ্দীপনা বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।পুলিশের লাঠি এড়িয়ে কেউ কেউ মেডিকেল কলেজ পেরিয়ে পরিষদ ভবনের দিকে এগোতে গেলে পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে যায়।জঙ্গী জেদে ছাত্ররা এগোতে থাকলে পুলিশ তাদের আটকানোর জন্য যথেচ্ছ লাঠিচার্জ শুরু করে।অব্যহত ছাত্র স্রোত ঠেকাতে পুলিশ টিয়ারগ্যাসের শেল ছুঁড়তে থাকে।”রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” “চলো চলো অ্যাসেম্বলি চলো” শ্লোগান দিতে দিতে পালটা ইঁট পাটকেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে পুলিশের দিকে তেড়ে যায়।দুপুর একটার পর আন্দোলন আর ও তীব্র আকার নিতে থাকে।কেননা দুপুর তিনটের সময় পরিষদে মিটিংটা হওয়ার কথা ছিল।তাই ধৈর্যচ্যুতি হতে দেখা যায় দু পক্ষেই।দু ঘন্টা ধরে এই বিশৃঙ্খল অবস্থা চলতে থাকে।অবশেষে বেলা তিনটের কিছু পরে(প্রত্যক্ষদর্শী দের মতে ৩.১০ নাগাদ) পুলিশ বেশ কিছু গুলিবর্ষণ করে(পরের দিন দৈনিক সংবাদ পত্রে,পুলিশের ২৭ রাউন্ড গুলিবর্ষণের সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে তদন্তের আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী)। গুলি চালনোর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে ‘ওয়ার্নিং’দেওয়া হলে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা লাঠিধারী পুলিশরা পিছনে সরে আসে।সামনে চলে আসে পিছনে থাকা ১৮/২০ জন বন্দুকধারীর একটি দল।এরপরেই এলোপাথাড়ি গুলি চলতে শুরু করে।প্রথমেই গুলি এসে লাগে মানিকগঞ্জ এর ছাত্র বাদামতলীর কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র। রফিকউদ্দিন  আহমেদের মাথায়।গুলিতে তার খুলি উড়ে গিয়ে ঘিলু বেরিয়ে যায়।ঘিলু সহ মাথার বেশ খানিকটা অংশ পাশের খড় কুটোর মধ্যে গিয়ে পড়ে।এক ছাত্র সেটা কাগজে মুড়ে হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে নিয়ে আসে,ছিন্নভিন্ন দেহের সঙ্গেই।একজন মেডিকেল কলেজের নিচুতলার কর্মচারী রফিকউদ্দিনের মগজটা আলাদা করে তুলে স্ট্রেচারে রাখে।আর কম্বলে মুড়ে স্ট্রেচারে রেখে দেয়।বহুক্ষন বডিটা এমার্জেন্সির মাটিতে পড়ে থাকে।
সেসময় ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন আবদুল গফফর চৌধুরী।তিনি গুলি চালানোর খবর শুনে ঢাকা মেডিকেলে যান আহত ছাত্রদের দেখতে। ঢাকা মেডিকেলের আউটডোরে তিনি মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একটি লাশ দেখতে পান,শোনেন সেটি ছিল এক ভাষা সংগ্রামীর লাশ। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ তিনি।(পরে রফিকউদ্দিন এর ভগ্নীপতি মোবারক আলি লাশ শনাক্ত করেন) লাশটি দেখে তাঁর মনে হয়, এটা যেন তাঁর নিজের ভাইয়েরই রক্তমাখা লাশ। তৎক্ষনাৎ তাঁর মনে গানের প্রথম দুটি লাইন জেগে উঠে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। পরে কয়েকদিনের মধ্যে ধীরে ধীরে তিনি গানটি লিখেও ফেলেন।
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর নিজের কথায়….. “আমি তখন ঢাকার আরমানিটোলার বান্ধব কুটিরে থাকতাম। সেখানে গিয়ে দেখি সরকার নোটিস দিয়েছে বান্ধব কুটিরে ছাত্ররা থাকতে পারবে না। তারপর শফিক রেহমানের বেগমবাজারের নূরপুর ভিলায় উঠলাম। সেখানে গিয়ে কবিতাটি আরও কয়েক প্যারা লিখি। আবার বাসা পাল্টে বংশালে আমার বন্ধু দাউদ খান মজলিসের বাসায় উঠি। তখন আমার এক বন্ধু আহমদ হোসেন এসে বলল, আমরা গেণ্ডারিয়াতে একটি গোপন সভা করছি। ওখান থেকে একটি লিফলেট বের হবে। কবিতাটা দ্রুত শেষ করে দাও। ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রকাশিত লিফলেটে এটি ‘একুশের গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। তখন গীতিকারের নাম ছাপা হয়নি। পরবর্তীতে অবশ্য গীতিকারের নাম ছাপা হয়। ১৯৫৪ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে সংকলন’-এ প্রকাশিত হয় গানটি। তৎকালীন সরকার সংকলনটি বাজেয়াপ্ত করে।
ভাষা আন্দোলনে আমাদের যে লিফলেট বের হয় সেটা তৎকালীন যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক শিল্পী আবদুল লতিফ ভাইয়ের হাতে গিয়ে পৌঁছায়। এটি পৌঁছে দিয়েছিল রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী আতিকুল ইসলাম।  আবদুল লতিফ ভাই, গানটির প্রথম সুর দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া শুরু করেন। তখন আমার সামনে আই এ পরীক্ষা। এর আগেই আলতাফ মাহমুদ, যিনি সে সময়কার একজন নামকরা সুরকার এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, আসেন। তাঁর বাড়ি  বরিশালের মুলাদি উপজেলায়। তিনি বলেন, তোর এ গানটিকে নতুন সুর দেব। তিনি সুর দিলেন। পরে তার সুরটিই সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়। ১৯৫৪ তে আলতাফ মাহমুদের সুরে প্রভাত ফেরির গান হলো। বর্তমানে এটিই গানটির প্রাতিষ্ঠানিক সুর হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। কিন্তু গান লেখা ও গাওয়ার অপরাধে ঢাকা কলেজ থেকে একসময় ১১ জন ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।”

এ গান শুনে জহির রায়হানের মাথায় পরিকল্পনা এলো গানটি তাঁর চলচ্চিত্রে ব্যবহার করার। ১৯৬৯ সালে তিনি তার ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে এ গানটি ব্যবহার করলেন। ফলে আরও জনপ্রিয় হলো। উল্লেখ্য, বিবিসি শ্রোতা সমীক্ষায় বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় এটি তৃতীয় স্থান লাভ করেছে।

প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরীতে বাংলাদেশের সব অঞ্চলে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শত শত মানুষ এই গান গেয়ে শহীদ মিনার অভিমুখে খালি পায়ে হেঁটে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান।

অনির্বান ভট্টাচার্য

অনির্বান ভট্টাচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *