“একটি ঘৃন্য গল্প”(অনু গল্প)-লেখক,সুমন সেন।

depressionপূর্ণিমার চাঁদটার আশেপাশে একটিও তারা দেখা যাচ্ছে না আজ। চাঁদটারও অধিকাংশটাই মেঘের দ্বারা আচ্ছাদিত।

সুচিত্রা আত্মহত্যা করেছে আজ।একটি গামছা গলায় পেঁচিয়ে সিলিং ফ্যান-এর মাধ্যমে ঝুলে পড়েছে সে। তার বাবা সোমনাথ, হন্তদন্ত হয়ে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে এসেছে। একদৃষ্টে মেয়ের ঝুলন্ত শরীরটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রাগ, কষ্ট, দুঃখে–মুখমন্ডলে কিরকম অভিব্যক্তি আসে, তা তার জানা নেই। সে নির্বোধের মত শুধু তাকিয়েই রয়েছে।

এইতো… দেড় মাস হ’ল মাত্র সুচিত্রার কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে। হঠাত্‌ করেই ধরা পড়েছিল– তার দুটো কিডনিই খারাপ হয়ে গিয়েছে। সোমনাথ মধ্যবিত্ত। বাজারে একটি খেলনার দোকান আছে তার। হঠাত্‌ করে অমন একটা খবর পেয়ে তার মাথায় যেন বজ্রপাত হয়েছিল! তত্‌ক্ষনাত্‌ কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট না করাতে পারলে – মেয়েকে বাঁচানো সম্ভব নয়। পরে অবশ্য টাকা-পয়সার সমস্যার সমাধান হয়েছিল। অপারেশন এবং ওষুধ-পথ্যে মোটামুটি কত টাকা খরচ হ’তে পারে–সেটা হিসেব করে, এক খুবই ঘনিষ্ট বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু, কিডনি ডোনার পাওয়া এবং তার কাছ থেকে কিডনি কেনা তো চারটি-খানি কথা নয়! অনেক টাকা এবং সময়সাধ্য ব্যাপার। অবশেষে নিজের দুটি সচল কিডনির মধ্যে একটি– সুচিত্রাকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সোমনাথ।

অপারেশন ভালোভাবেই হয়েছিল।সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল।সুচিত্রাও সুস্থ হয়ে উঠছিল দিনে দিনে। কিন্তু আজ…এটা কি হ’ল? সোমনাথ মনে মনে কিছুতেই এইরকম পরিস্থিতি হ’বার কারণ খুঁজে পেল না।

***

তিনমাস আগেঃ

ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে সুচিত্রার, তারই সাথে কলেজে পড়ে একটি ছেলের সাথে। ছেলেটির নামঃ শুভজিত। ভদ্র ঘরের ছেলে। তার বাবার আমদানী-রপ্তানী-র ব্যবসা রয়েছে। তবে, ভালোবাসার কথাটি নিজের বাবাকে জানায়নি সুচিত্রা।

সুচিত্রার যখন ৬ বছর বয়স, তখন তার মা মারা যায়। আত্মীয়দের অনেক বোঝানো সত্বেও আর বিয়ে করেনি সোমনাথ। তার কথায়ঃ সত্‌ মায়েরা নাকি বাচ্চাদের সঠিকভাবে দেখাশুনা করে না। তাই সে একাই সুচিত্রার সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে চায়।

তারপর, দেখতে দেখতে বড় হয়ে যায় সুচিত্রা। একসময় সোমনাথের মাথায় আসে-ভবিষ্যতের কথা। বিয়ের পর মেয়ে পর হয়ে যাবে, তখন? তখন কি করবে সে? মেয়েকে সোমনাথ খুব ভালোবাসে। নিজের চোখের বাইরে তাকে সে রাখতে পারবে না। সে ভেবেই রেখেছেঃ এমন একজনকে সে জামাই করবে–যে তার মেয়েকে নিয়ে তারই বাড়িতে থাকবে। একথা সুচিত্রারও অজানা নয়। তাইতো সে তার বাবাকে বলতে পারেনি শুভজিতের কথা। শুভজিত তার বাবা-মায়ের একটিই ছেলে, ব্যবসা-পত্র ছেড়ে সে মোটেই কারুর বাড়িতে গিয়ে ঘর-জামাই হয়ে থাকবে না। সুচিত্রা ভেবেছিলঃ পরে নিশ্চই ভাবনা-চিন্তা করে একটা ব্যবস্থা করা যাবে!

***

“আজকাল বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস সুচি। এখন কি আমাক আগের মত ভালোবাসিস না?” –শুভজিত বলল।

কথাটা মানতে পারল না সুচিত্রা। আবার নগ্ন হল সে। উন্মত্তের মত নগ্ন প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেল তারা।

এটা প্রথম নয়। আগেও বহুবার ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে–ভালোবাসার সীমানার বাইরে গিয়ে, শুভজিতের সামনে নগ্ন হয়েছে সুচিত্রা। সে যে শুভজিতকে মন থেকে ভালোবাসে এবং অন্ধের মত বিশ্বাস করে!

***

হাসপাতালে থাকা কালে, সুচিত্রার ভালোবাসার মানুষটি খোঁজ নেয়নি একবারও। কু-ডাকছিল সুচিত্রার মনে। শুভজিতের ভাবী স্ত্রী-এর এত বড় একটা অপারেশন, সে কিভাবে খোঁজ না নিয়ে থাকতে পারে?!

একটু সুস্থ হয়েই শুভজিতের বাড়িতে যায় সুচিত্রা। আজ শুভজিতের বলার আগেই নগ্ন হয়ে যায় সুচিত্রা – তার সামনে। নিজেকে সামলাতে না পেরে শুভজিত আবার প্রেম জোয়ারে ভাসতে চলে আসে সুচিত্রার কাছে। কিন্তু পরক্ষনেই, সুচিত্রার পিঠের নীচে হাত পড়ায় – ডুবে যায় শুভজিতের প্রেম। এক ঝট্‌কায় সুচিত্রার থেকে দূরে চলে আসে সে।

“কি হ’ল?” –জিজ্ঞেস করে সুচিত্রা।

“আমি পারব না, আমায় ক্ষমা করে দে। আমি তোকে বিয়ে করতে পারব না।”–বলল শুভজিত।

মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ল সুচিত্রার। এ কি বলছে শুভজিত?!

শুভজিত আরও বলল, “একটা কিডনি মানুষের শরীর থেকে চলে গেলে–তার আয়ু অর্ধেক হয়ে যায়। তাছাড়া তোর পেটের পাশে… ওই লম্বা কাটা দাগ…,ওতে হাত দিয়েই শিউড়ে উঠছি আমি। কেমন একটা আন-কম্ফোর্টেবল ফিল করছি। এ’রকম ভাবে আমি পারব না…”

কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছে সুচিত্রা। হাতের কাছে রাখা চুড়িদার ও প্যান্ট-টা কোনোরকমে গলিয়েই বাড়ির উদ্দেশ্যে দৌড়াতে শুরু করে সে।

বাড়ি ফিরে ঘরের দরজা বন্ধ করে, ফুল-ভলিউমে গান চালিয়ে–চিৎকার করে কাঁদতে থাকে সে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না–শুভজিত তাকে এ’কথা বলেছে। তবে কি শুভজিত তাকে কোনোদিন ভালোই বাসেনি? শুধুমাত্র…! কিন্তু,সে তো শুভজিতকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল! অন্ধের মত বিশ্বাস করেছিল তাকে!

অনেক্ষন বসে থেকে একটা বুদ্ধি পাকাল সে। একটি গামছা সিলিং ফ্যান-এ বেঁধে, অপরপ্রান্ত নিজের গলায় পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ল সে।

পাশের বাড়ির বিন্দু মাসি হলুদ চাইতে এসে দেখেঃ ঝুলে রয়েছে সুচিত্রা। খবর পেয়ে সোমনাথ সাড়ে-আটটার সময়েই দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে আসে।

নির্বাক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে ঝুলন্ত সুচিত্রার দিকে। এই পরিনতির কথা ভেবে–কিছুতেই কূল-কিণারা খুঁজে পায়না সে। কষ্টে তার বুকটা মনে হয় ফেটে যাচ্ছে।

পুলিশ এলো মনে হয়। বাইরে গাড়ির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

সুমন সেন

সুমন সেন

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *