“আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে এক রেড ইন্ডিয়ানের চিঠি”- লিখেছেন, দেবাশীষ পাইন

earth_625x350_81465111956ফিচার ডেস্কঃ  আজ থেকে ১৬০ বছর আগে এক নাম না জানা রেড ইন্ডিয়ানের চিঠিতে ফুটে উঠেছিল, পরিবেশের সাথে মানবসভ্যতার সম্পর্ক কতটা নিবিড়।সেই অজানা রেড ইন্ডিয়ানের আবেগভরা চিঠিটি ছিল আমেরিকার ১৪তম প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন পিয়ার্সের উদ্দেশ্যে।সময়টা ১৮৫৪,তদানীন্তন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সিয়াটলে বসবাসরত রেড ইন্ডিয়ানদের সিয়াটলে ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ সেখানে একটি আধুনিক সভ্য শহর গড়ে তোলা হবে।সিয়াটলের সেই রেড ইন্ডিয়ান সর্দার আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে আবেগময়ী ভাষায় একটি চিঠি লিখেছিলেন।সেই চিঠিতে সর্দার নিজেকে লাল মানুষ আর আমেরিকানদের শাদা মানুষ হিসেবে অভিহিত করেন।চিঠিটির শিরোনাম ছিলো: “ওয়াশিংটনের বড় সাদা সর্দারের কাছে সিয়াটল উপজাতি প্রধানের চিঠি”।

“কী  করে তোমরা বেচাকেনা করবে আকাশ, ধরিত্রীর উষ্ণতাকে? আমরা তোমাদের চিন্তা বুঝতে পারিনা।বাতাসের সতেজতা, জলের ঝিকমিক  আমরা তো এগুলোর মালিক নই, তাহলে তোমরা আমাদের থেকে এগুলো কিনবে কী করে? এই ধরিত্রীর প্রতিটি অংশই আমাদের লোকদের কাছে পবিত্র।পাইন গাছের প্রত্যেকটি চকচকে ডগা, বালুকাময় প্রতিটি সমুদ্রতট, অন্ধকার বনভূমিতে জমে থাকা কুয়াশা, প্রতিটি প্রান্তর, পতঙ্গের গুনগুন ধরা আছে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে। প্রতিটা বৃক্ষের ভিতর দিয়ে যে বৃক্ষরস প্রবাহিত হচ্ছে তারা লাল মানুষদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে।শাদা মানুষদের মৃতেরা তাদের নিজেদের দেশকে ভুলে দূর আকাশের তারার কাছে স্বর্গে চলে যায়, আমাদের মৃতেরা এই সুন্দর পৃথিবীকে কখনও ভোলেনা, কেননা এই পৃথিবী লাল মানুষদের মা। আমরা এই ধরিত্রীর অংশ, ধরিত্রীও আমাদের অংশ।সুগন্ধ ফুলগুলো আমাদের বোন, হরিণ,ঘোড়া,বিশাল ঈগল পাখি  এরা সবাই আমাদের ভাই। পাহাড়ের পাথুরে সব গহ্বর, সরস মাঠ, ঘোড়ার বাচ্চার গায়ের উষ্ণতা আর মানুষ সবকিছু মিলে আমাদের যৌথ পরিবার।তোমরা আমাদের বল যে তোমরা আমাদের  দেশ নিয়ে নেবে আর বিনিময়ে আমাদের বাস করার জন্যে একটা রিজার্ভ অঞ্চল দেবে যেখানে আমরা আরামে থাকব। আমরা তোমাদের কথা বিবেচনা করে দেখব।কিন্তু এটা এত সহজ নয়।এই ভূমি আমাদের কাছে পবিত্র।যদি আমরা এই ভূমি তোমাদের স্বেচ্ছায় দিয়ে দিই তাহলেও তোমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ভূমি পবিত্র।কথা দিতে হবে,তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের নিশ্চয় করে শেখাবে এর পবিত্রতার কথা।তাদের শিখিও যে এখানকার হ্রদগুলোর পরিষ্কার জলের মধ্যে দেখতে পাওয়া যে কোন রহস্যময় ছায়াই আমাদের মানুষদের জীবনের কোন না কোন ঘটনার স্মৃতি। ঝরণাগুলোর জলের মর্মরে আমার বাবার ও তার পিতৃপুরুষদের স্বর শোনা যায়।

নদীরা আমাদের ভাই, তারা আমাদের তৃষ্ণা মেটায়। নদীরা আমাদের ক্যানো (নৌকা)বয়ে নিয়ে যায়, আমাদের ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার যোগায়।যদি আমরা আমাদের দেশ তোমাদের দিই তাহলে তোমরা মনে রেখো, তোমাদের ছেলেমেয়েদের শিখিও  যে নদীরা মানুষের ভাই সুতরাং তোমরা নদীদের সে রকমই যত্ন করো, যেমন তোমরা তোমাদের ভাইদের করো।আমরা জানি শাদা মানুষেরা আমাদের ধরণধারণ বোঝে না।তার কাছে পৃথিবীর এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের কোন তফাৎ নেই।কেননা সে ভিনদেশী রাত্রির অন্ধকারে আসে, নিজের যা দরকার মাটির কাছ থেকে  কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যায়।এই ধরিত্রী তার আত্মীয় নয়, তার শত্রু।সে একে জয় করে, তারপর ফেলে দিয়ে যায়।সে পিছনে ফেলে দিয়ে যায় তার নিজের পিতার কবর, কিছুই মনে রাখতে চায় না। নিজের সন্তানদের কাছ থেকে পৃথিবীকে সে চুরি করে,কিছুই তার মনে হয়না। শাদা মানুষদের শহরে কোথাও শান্ত নিরিবিলি জায়গা নেই যেখানে বসে বসন্তকালে পাতার কুঁড়িগুলোর খুলে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। অবশ্য হয়তো আমরা জংলী বলেই আমাদের এ রকম মনে হয়।জীবনের কী মূল্য আছে যদি একজন মানুষ জলের ঘূর্ণির মধ্যে আপন মনে একাকী গুনগুন করার শব্দ শুনতে না পায়? আমি একটা লাল মানুষ, আমি তোমাদের শহরের কিছু বুঝতে পারি না।

আমরা, লাল লোকেরা ছোট পুকুরের জল ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের হালকা শব্দ শুনতে ভালোবাসি, ভালোবাসি দুপুরের বৃষ্টিতে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া বাতাসের নিজস্ব গন্ধ, পাইন বনের গন্ধ। আমরা তোমাদের দিয়ে যাব আমাদের জমি, আমাদের বাতাস। মনে রেখো, এই বাতাস, এই জমি আমাদের কাছে মূল্যবান, কেননা জীবজন্তু,গাছ,মানুষ সবার নিশ্বাস এই একই বাতাসের মধ্যে ধরা আছে।যে বাতাস আমাদের পূর্ব-পুরুষের বুকে তার প্রথম বাতাসটি দিয়েছিল, সেই বাতাসকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ধরে রেখেছে।তোমরা তোমাদের সন্তানদের শিখিও যে তাদের পায়ের তলায় যে মাটি, তাতে আছে তাদের পিতৃপুরুষের দেহাবশেষ, তাই মাটিকে যেন তারা শ্রদ্ধা করে।তোমাদের সন্তানকে শিখিও এই মাটিতে আছে তাদের পূর্বজদের ছাই। আমাদের স্বজনদের প্রাণ মাটিতে মিশে একে সমৃদ্ধ করেছে।একথা আমরা জানি যে পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি। মানুষই পৃথিবীর।আমরা একথা জানি। প্রতিটি জিনিসই একে অন্যের সাথে বাঁধা যেমন রক্তের সম্পর্ক একটা পরিবারের লোকদের বেঁধে রাখে।সবকিছুই একে অন্যের সাথে বাঁধা।এই পৃথিবীর যা হবে পৃথিবীর সন্তানদেরও তাই হবে।জীবনের এই ছড়ানো জাল,মানুষ একে  বোনেনি সে কেবল একটা সুতো মাত্র।এই জালটিকে সে যা করবে তার নিজেরও হবে ঠিক তাই।এমনকি শাদা লোকেরা, যাদের ঈশ্বর বন্ধুর মত তাদের সাথে চলাফেরা করেন,কথা বলেন, তারাও সকলে এই সাধারণ নিয়তির বাইরে নয়।শেষ অবধি হয়ত দেখা যাবে যে আমরা সকলেই একে অন্যের ভাই।যে কথা আমি জানি, হয়ত একদিন সে কথা শাদারা বুঝতে পারবে যে আমাদের ঈশ্বর আসলে একই।“

সিয়াটলের রেড ইন্ডিয়ান সর্দার এক শতাব্দী আগে পরিবেশের সাথে মানব সভ্যতার যে সম্পর্ক উপলদ্ধি করেছিলেন আজকের এই বস্তুবাদী সভ্যতাগর্বী আধুনিক মানুষরা কি তা উপলদ্ধি করতে পারছে? অনেকটা বড় প্রশ্ন।যদি পারত তাহলে আমাদের বুড়িগঙ্গা নর্দমায় পরিণত হতো না।শীতালক্ষ্যা নদী আজ কেমিক্যালের বিষে নীল।নদীর বুকে গড়ে বালুর চর,সেই গড়ে উঠছে আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা।তিতাস কেন আজ এক মরা নদীর নাম।গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের উজানে ৫৪টি বাঁধ দিয়ে মানুষ আর জীববৈচিত্রকে খতম করা হয়েছে।ধ্বংসের পথে বিশ্ব জীবনবৈচিত্র্যের মূল্যবান সম্পদ সুন্দরবন।আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে নিজের লাভটাকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে আগ্রাসি জীবনযাপন করলে পরিবেশ বাঁচবে না। পরিবেশ না বাঁচলে পৃথিবী টিকবে না।আর পৃথিবী না থাকলে আমরা??? আসুন আমরা সকলে মিলে আমাদের এই সাধের পৃথিবীটাকে বাঁচানোর সংকল্পে ব্রতি হই।

*তথ্য ও তর্জমা সংগৃহীত

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *