আমি প্রমোদ গায়িকা– দেবাদিত্য দেবাংশী

ti_725_1411365789541fbb9dd0ef2আমি এক প্রমোদ গায়িকা।মানে,লোকসমাজে  যাদেরকে চলতি ভাষায়  বার শিঙ্গার বলা হয়।আমাদের কাজ,পানশালায় আগত মানুষজনদের মনোরঞ্জন করা।প্রতিদিন সন্ধায় রকমফের মানুষরা তাদের নিজ নিজ চাহিদা পুরনের ক্ষেত্রস্থল করে তোলে  এই পানশালাগুলোকে।আর আমরা হলাম গভীর রাত অবধি চলা এই পানশালাগুলির মক্ষিরানি।কত মানুষই তো আসে,কেউ আসে সারাদিন পরিশ্রমের ক্লান্তিকে দুর করে মেজাজটাকে সরিফ করে নিতে।কেউ আসে হতাশ জীবনে মলমের প্রলেপ লাগাতে।কেউবা সম্পর্কের টানাপোড়েনে তিতিবিরক্ত জীবনে সামান্য সময়ের জন্য সুখ খুঁজে পেতে । বাকি বেশিরভাগটাই অন্য মধুর সন্ধানে প্রতিরাতে হানা দেয় মধুশালায়।আমি বুঝি-চোখে চোখ রাখলেই পড়ে নিতে পারি চাহিদার আনাগোনাকে।আমরা শিখেছি,সময়ের আগুন আমাদের পুড়িয়ে পুড়িয়ে খাঁটি করেছে, শিখিয়েছে।তাই যার যেমন চাহিদা তেমনই গাজর ঝোলাই।ঝলমলে স্বল্পবসনা হয়ে মাইক্রোফোন হাতে আমি রাতের রজনিগন্ধা।এতটা অবধি শুনে নাকটা  নিশ্চয়  একটু কুঁচকে গেল ।আর হবে নাই বা কেন, আমি যে ‘বার’ এ গান গাই।

এবার আসি আমার কথায়। আমি হিয়া নামে বিখ্যাত।যদিও এটা আমার আসল নাম নয়।আদর করে পানশালার মধুকরদের দেওয়া নাম।গ্রাহকরা আমার টানে পানশালায় ভিড় করে তাই বারের মালিক বেশ তোয়াজ করে। আমার আসল নাম শ্রাবন্যা ঘোস চৌধুরি।এই নামটা কবে যে বেবাক ভুলে গেছি নিজেরই মনে নেই। ভোলাটার মধ্যেও কোন অস্বাভাবিকতা নেই।  আজ প্রায় ৫ বছর হল আমি মা-ভাই ও ঘর ছাড়া তাই ঐ নামটা ধরে আর কেউ ডাকে না।মাষের খরচের টাকা বাড়ি পাঠিয়ে দি ব্যাস ওইটুকুই আমার  বাড়ির সঙ্গে  সম্পর্ক। মাঝে মধ্যে বাড়ি যেতে প্রবল ইচ্ছে হয় কিন্তু গেলেই সেই দিনটার কথা আমার  মনে পড়ে যায়। নিজেকে তখন সামলাতে পারি না। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। সেদিন সবে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছি। বাড়ির দরজা হাট করে খোলা। ঘরে ঢুকে দেখি মা ঘরের কোনায় ভাইকে জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে কাঁদছে। ভাই কিছু না বুঝেই কাঁদছে। মা কাঁদছে তাই সেও। তখন আমার বয়স ছোট ছিল ঠিকই তবুও ক্লাস এইটে তো পড়ি, তাই মায়ের কান্নাবিলাপের কারন খানিকটা আন্দাজ করতে পারছিলাম। এদানিং বাবা রাতে প্রায়শই বাড়ি ফিরত না। মায়ের সঙ্গে নিত্য ঝগড়া লেগেই থাকত কোন এক মালতি মাসিকে কেন্দ্র করে ।বাবার বিরুদ্ধে মায়ের অভিযোগ ছিল তিনি রোজগারের সবটাই মালতি মাসির পেছনে ঢেলে আসছেন। মায়ের দাবী ছিল বাবাকে নিয়ম মতো সংসারে টাকা দিতে হবে নাহলে ছেলে মেয়ে নিয়ে মা কোথায় দাঁড়াবে।এই দাবী জানাতে গিয়ে মাকে প্রায়শই বাবার হাতে চোরের মার খেতে দেখেছি।তাই যখন শুনলাম যে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন,শোনার পর আমি একটুও অবাক হয়নি।ভাই আর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে  মনটাকে শক্ত করে নিয়েছিলাম।সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ চলেছিল সারারাত।একদিকে নিজের জীবন আরেকদিকে মা ও ভায়ের মুখ। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম সংসারটাকে বাঁচাতে হবেই।

পরেরদিন সকালে মাকে খালি জিজ্ঞাসা করেছিলাম  কদিনের মতো সংসার চালানোর রসদ মজুদ আছে।মিনমিনে স্বরে মা জবাব দিয়েছিল বড় জোর সপ্তাহ খানেক। বাসি রুটি চায়ে চুবিয়ে খেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম কাজের খোঁজে। কি কাজ পাবো জানা ছিল না শুধু জানতাম  যেকোন কাজ আমায় পেতেই হবে। ধারনা ছিল যে কাজ পেতে গেলে যোগ্যতা লাগে,আমার যোগ্যতা বলতে মাত্র দুটি -এক ক্লাস এইট পর্যন্ত বিদ্যা দ্বিতীয়টি নাচ। উদভ্রান্তের মতো সারাদিন ঘুরে বেরালাম কিন্তু কোথায় কাজ। সন্ধ্যে নাগাদ বাড়ি ফিরে মাকে বললাম খেতে দাও। ভাতের থালা,হাত আর মুখের খানিক যুদ্ধ চলল। খেলাম না গিললাম জানি না তবে পেটে দল পড়ল। শরীরটাও এলিয়ে পড়তে চেয়েছিল কিন্তু হল না।সেদিনও সারারাত  দুচোখের পাতা গুহামুখের মতো খোলা ছিল।হটাত দোলনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠার পর ভোরের দিকে চোখটা লেগে গিয়েছিল।

সকাল সকাল চা রুটি খেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম দোলনের বাড়ির উদ্দেশ্যে।আমাদের স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে দোলনের যৌবন এসেছিল সবার আগে। দোলন সেটা জানত তাই দেখনদারি করতে কসুর করতো না। ওর সাহস মাঝে মাঝে আমায় বিস্মিত করতো। ওকে আমি একটু এড়িয়ে চলতাম। কলোনির খোলার ঘরে বসবাস করতাম কিন্তু দোলনের মতো হতে পারিনি। আমার ভেতর একটা অজানা ভয় কাজ করতো।তাই নাচ আর পড়াশোনার মধ্যেই নিজেকে সিমাবদ্ধ রেখেছিলাম। চলাফেরারা পথে দোলনকে দেখে কলোনির মা কাকিমারা ফিস ফিস করে আলোচনা করতো। আমিও দেখতাম দোলনের সাজ পোশাকের ঠাট ঠমকের ঝলক। রাস্তায় দেখা হলে বলত, চল রেস্টুরেন্ট বাজী করে আসি। একদিন গিয়েও ছিলাম। ও আমায় বিরিয়ানি খাইয়েছিল। সেদিন ওর ভেনিটি ব্যাগে অনেক টাকা দেখেছিলাম।

বাড়ির বাইরে থেকে দোলনকে ডাক দিলাম। দোলন দরজা খুলে আমায় দেখে খানিকটা বিস্ময় প্রকাশ করল। আমার হাতটা ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বসাল। কিছু বলবি ‘সাবু’? আমি হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে বললাম আমায় একটা কাজের জোগাড় করে দে।সংসারে কি হয়েছে সবিস্তারে ঘটনাটা বললাম। দোলন চুপ করে শুনল। শুধু বলল খেয়েছিস কিছু? হ্যা- চা রুটি খেয়ে বেরিয়েছি। দোলন এবার খুব শান্ত কণ্ঠে আমার চোখের ওপর চোখ রেখে বলতে শুরু করল- তোর লোকনিন্দার পরোয়া না থাকলে আমি কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বললাম ওসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, লোকে কি আমার সংসারের মুখে অন্ন জোগাবে। নিজের ইজ্জত বাঁচিয়ে আমি যে কোন কাজ করতে রাজী আছি। দোলন হাততালি দিয়ে বলে উঠল-যা তোর কাজের ব্যবস্থা হয়ে গেছে।কি কাজ করতে হবে জানতে চাইলাম দোলনের কাছে। কিচ্ছু না, স্রেফ গানের সঙ্গে নেচে যাবি।দেখবি টাকার ফোয়ারা কাকে বলে!চল আজ আমি তোকে নিজের হাতে সাজাব।

কাজ জুটলল বারাসাতের  এক পানশালায়।ঝিকিমিকি ছোট পোশাক পরে নাচের দালানে এলাম। দোলন বেশ শক্ত করে আমার হাতের মুঠি চেপে ধরে ছিল। বার বার বলছিল একদম ঘাবড়াবি না,আমার ওপর ভরসা রাখ। মনে পড়ে সেই প্রথম দিনটা বেশ ভালই উতরে ছিলাম।অনেক রাতে ভাগের টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। মায়ের হাতে টাকা কটা তুলে দিয়ে বলেছিলাম, চিন্তা করো না আমি আছি।

কয়েকদিনের মধ্যে আদরের  নাম পেলাম হিয়া।বেশ ভালই কাটছিল প্রতিরাতে। দেখতাম কত লোক আসে আকণ্ঠ  মদ্যপান করে  নেশা করার জন্য  আর গাদাগাদা  টাকা  ওড়ায়।ঐ টাকার  অর্ধেক ছিল আমার রোজগার। বাবার বয়সী  অনেকেই আমার   মোবাইল নং  নিত গভীর রাতে ফোন  করত। বাবার বয়সী লোকগুলো ফোন করলে তাদের সাথে কথা বলতাম কিন্তু নিজের তৈরি করা সিমারেখার মধ্যে। ভাবতাম বাবার বয়সী,কাকুর বয়সী লোকগুলো যদি আমার সঙ্গে দুদণ্ড কথা বলে শান্তি পায় তো পাক না। আমার সরলতার  ভুল ভাঙতে বেশী সময় লাগেনি। যেদিন এক কাকুর  বয়সী লোকের দেওয়া  কুপ্রস্তাবে সরাসরি মুখের ওপর  না বললাম। পরে দেখলাম ঐ কাকুটি পানশালায় আসে, নাচ দেখে কিন্তু আর  টাকা দেয় না। আস্তে আস্তে যখন সবার প্রস্তাব নাকচ করতে লাগলাম  তখন দেখলাম আমার কালেকশান কমতে শুরু করেছে। কিছুতেই ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না আমি দোষটা কি করলাম? আমি তো একজন নৃত্যশিল্পী। আমার নাচের কদরদানরা খুশী হয়ে বকশিস দেয়। আমিতো এদের কাকু- দাদা এসব সামাজিক মর্যাদা দিতাম। খুব যখন ভেঙ্গে পড়েছি তখন একদিন দোলন আমায় বোঝাল। সাবু, তুই যতই এদের বাবা,কাকা বা দাদা ভাবিশ না কেন আসলে তুই  এদের চোখে পন্য ছাড়া আর কিছুই নোশ। এরা সবাই তোকে  ওদের বিছানায় পেতে চায়।ভাবতে  লজ্জা পেলাম, সর্বাঙ্গ ঘিনঘিন করে উঠল। এদের পরিবারের মেয়েরা হয়তো আমার সমবয়সী বা বড় হবে। এদের কদর্য রুপগুলো সামনে আসার পর চিন্তায় পড়লাম।এই লালসাশক্তির সঙ্গে যুজবো কি করে!আবার এ কথাটাও মাথায় এলো যে শুধু  লজ্জা দিয়ে তো নিজের ও পরিবারের পেট ভরবে না তাই আমি দোলনের পরামর্শে নতুন খেলা শুরু করলাম। অভিনয় আরম্ভ করলান। এক এক সময় মাথা ঝিমঝিম করতো। ফোনের প্রেমালাপে কি সব ভাষা! পান্কশালার বাঁধা খদ্দেরদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ যৌন আলাপ করতে এক প্রকার বাধ্য হতাম নাহলেই রোজগার তলানিতে এসে ঠেকবে। রাতে  নিজের বিছানায় শুয়ে শুয়ে যখন  ওদের সঙ্গে কথা  বলতাম তখন মরমে মরে যেতাম।

এইভাবে লুকোচুরির খেলা চলছিল  বেস।দমবন্ধ করা বদ্ধ জীবনের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে নিয়েছিলাম। হটাত করে একদিন তাজা হাওয়া বয়ে গেল আমার জীবনে। প্রেম এলো আমার জীবনে! আমার প্রেমিক একজন  ডাক্তার।পানশালাতেই আলাপ হয়েছিল। প্রতিদিন রাতে যাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলি তাদের চাইতে ডাক্তারকে আলাদা মনে হয়েছিল তাই কাছাকাছি আসতে বেশী সময় লাগেনি। আমরা পানশালার  বাইরে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছিলাম। মুঠোর মধ্যে বার গায়িকাকে পেয়েও হামলে পড়েনি।বুঝেছিলাম সে আমায়  ভালবাসে। ধিরে ধিরে আমরা ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি এমন সময় ডাক্তার একদিন সর্ত দিল আমায় বার এ নাচ গান ছাড়তে হবে। নাহলে ওর পক্ষে আমায় বিয়ে করা সম্ভব নয়। আমি ওর সর্ত শুনে আকাশ থেকে পড়লাম।ভাবলাম ডাক্তার তো জানত যে আমার সংসার চলে আমার রোজগারের টাকায়।আমি কোন কিছুই ওর কাছে লুকোই নি তাহলে সব জেনেও কেন এমন সর্ত দিল!সে এক পাগল পাগল অবস্থা আমার। ঘর বাঁধার স্বপ্ন হাত পিছলে বেড়িয়ে যাচ্ছে মেনে নিতে পারছিলাম না। রঙিন জগত থেকে বাস্তবের মাটিতে আসতে কয়েকদিন সময় লেগেছিল ঠিকই কিন্তু  বুঝলাম শিমুল ফুল দেখতে সুন্দর বটে তবে  দেবতার পুজোয়  লাগেনা। আবার পুরনো পরিচয়ে বেঁচে থাকা। আমি বার সিংগার। মাঝের বেশ কয়েক বছর কেটে গেল এ বার সে বার করতে করতে মানুষের  রুপ দেখতে দেখতে। শুরু করলাম একের পর এক কামলোভী মানুষগুলোর সাথে প্রেমের অভিনয়। পুরুষদের সম্পর্কে আমার বদ্ধমুল ধারনার পরিবর্তন এলো রুদ্রর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর।  বুঝতে পারলাম সবাই এক নয়। এমনও মানুষ আছে যারা সত্যি  আমাদের বোঝে।  রুদ্র ঠিক তেমনটাই মানুষ ছিল। বার এ আসত এককোনায়  বসে চুপচাপ  মদ্যপান করতো আর গান শুনত, নাচ দেখত। আমি নাচের দালানে এলে ওর চোখে একটা মুগ্ধতা লক্ষ করেছিলাম। একদিন সঙ্কোচ নিয়ে আমায়  বলল, সে আমায় ভালবাসে।আমি বিশ্বাস করতে পারিনি, মানে বিশ্বাস করতে ভয় পেয়েছিলাম তাই বার বার রুদ্রকে ফিরিয়ে দিয়েছি। হয়ত সত্যিই ভালবাসে  কিন্তু মন সাড়া দিতে চায়নি। এটা হয়ত আমার অক্ষমতা।

এই সমাজের  ভদ্রলোকগুলোর কাছে  প্রস্ন, আমরা কি মানুষ নই? লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে কেমন করে তোমরা  নিজেদের  মেয়ের বয়সীদের শরীর ভোগ করতে  চাও? কেন ভাব না যে আমরা শিল্পী গনিকা নই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *