“আমরা অসুর জাতি—পুরোহিত মানি না”।উমেশ শর্মা

maxresdefaultআমরা অসুর জাতি।আমরা মহিষাসুরের বংশধর।আমাদের জন্ম,বিবাহ,মৃত্যুর সময়ে রীতি রেওয়াজে পুরোহিতের কোন ভূমিকা নেই।আমরা হিন্দু দেব দেবীর পুজো করি না।আমরা দুর্গার মুখ দর্শন করি না।কথাগুলো ইন্দ্রকে বলেছিলেন ‘চুরু অসুর’।

দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে অসুরদের বিরোধের কথা সর্বজনবিদিত।যতদিন ইন্দ্র ‘আত্মা’ কি অজ্ঞাত ছিল ততদিন অসুরেরা ছিলেন ইন্দ্রের থেকে শ্রেষ্ঠ,ক্ষমতাশালী ও জ্ঞানবান।আত্মাকে জেনে ক্ষমতাশালী ইন্দ্র অসুরদের পরাজিত করেছিলেন।জ্ঞানই হল আত্মা।আত্মোউপলব্ধি হিন মাত্রেই অসুর।জ্ঞানহীন ব্যক্তিমাত্রই অসুর।

যখন ইন্দ্রের রাজধানী সুধাকে অসুরেরা চারিদিক থেকে আক্রমন করে গুড়িয়ে দিয়েছিল,দেবতারা অসুরদের ভয়ে ভিত,সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল।দেবতাদের মনে একটাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল-কে অসুরদের জয় করতে পারবে?দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন।অসুর নিধনে সব দেবতাই ব্রহ্মার সাহায্য প্রার্থনা করলেন।ব্রহ্মার কণ্ঠে ‘ওম’ ধ্বনিতে মূর্তিময় হয়ে উঠলেন ‘ওম’ অর্থাৎ প্রনব।তিনি এই কাজের পুরস্কার চাইলে প্রজাপতি বললেন,অসুরেরা ‘ওম’ উচ্চারণ না করে বেদ পাঠ করতে পারবে না।যদি করে তাহলে বেদ পাঠ ব্যর্থ হবে।

অসুরেরা ‘ওম’ উচ্চারণে অসম্মত হন।শুধু ব্রহ্মা কেন,অসুরেরা কোন দেবতারই নাম উচ্চারণ করতে অসম্মত ছিল।তাই অসুরদের বেদজ্ঞানহীন বলা হয়।অসুরেরা ‘ওম’ উচ্চারণে ঘৃনা প্রকাশ করে শপথ নিয়েছিল।

১)যেহেতু ঘৃত যজ্ঞাগ্নিতে ব্যবহার করা হয় তাই ঘি তারা স্পর্শ করবেন না।

২)গঙ্গাজল যেহেতু যজ্ঞে ব্যবহৃত হয় তাই তারা গঙ্গাজল বর্জন করবেন।

৩)ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে সহায়তা করেছিলেন বলে ‘বসু’দের ও ‘রুদ্র’দের বর্জন করবেন।

৪)ইন্দ্র যুদ্ধে অগ্নিকে,গায়ত্রিকে ও শেষে একাক্ষরা ‘ওম’কে যুদ্ধে প্রেরন করেছিলেন,তাই তারা এঁদেরকেও বর্জন করবেন।

৫)মহিষাসুরের বধকারী দুর্গা ও দুর্গাকে সাহায্যকারী দেবতাদের মুখদর্শন করবেন না।

এযুগেও প্রাক-ইতিহাসিক যুগের অসুরেরা জলপাইগুড়ি কোচবিহারে বসবাস করে।কোচবিহার জেলার মাথাভাঙ্গা থানার অন্তর্গত কেদারহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের ইন্দ্রের কুঠি গ্রামে বসবাস করে বুধুয়া অসুর,বাচ্চাবু অসুর,চিউই অসুর,লালকু অসুরদের।পোঠেয়া,মাকু,সোমা,চুরু,আগনু,মন্টুদের বাড়ি সামান্য পূর্বদিকে বাগবাড়ীতে।

জামালদহ থেকে মাথাভাঙ্গা গামী ৮ কিলোমিটার দূরে ইচ্ছাগঞ্জ মোড়,হাইস্কুল।বাঁয়ে গিলাডাঙ্গা গামী রাস্তা ধরে সুটুঙ্গানদী,নয়ারহাট পেরিয়ে পাখিহাগা গ্রামে বাচ্চাবু,বুধুয়া,হাগুরা অসুরদের বাড়ি।বাচ্চাবু দম্পতির এক পুত্র ও পাঁচ কন্যা।চিউই-নদিয়ো দম্পতির কোন সন্তান নেই।হাগুয়া-প্রমীলার দুই পুত্র ও দুই কন্যা।এই তিনটি পরিবারে সবচেয়ে শিক্ষিত ছেলে প্রেম অসুর সপ্তম শ্রেণী অবধি পড়েছে।সবচেয়ে শিক্ষিতা মেয়ে সুজিতা অসুর সে পঞ্ছম শ্রেণী অবধি পড়েছে।

বাচ্ছু,চিউই,হাগুরা কাটা পাঁচেক জমির ওপর আলাদা আলাদা সংসারে থাকে।ঘরগুলোর চাল ভেঙ্গে পড়েছে।জমি জায়গা নেই।অন্যের জমিতে জন খেটে সংসার চালায়।সেদিক থেকে কিছুটা সচ্ছল অবস্তা বাগবাড়ির চুরু অসুর,মন্টু অসুরদের।পোঠেয়া,মাকু,সোমা,আগুনুদের বাড়িঘর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।এদের দু চার জনের সামান্য হলেও জমি জায়গা আছে,গরু-ছাগল আছে।গাছ গাছালি,বাঁশঝাড় দিয়ে ঘেরা বাড়িগুলি বেশ ছায়াচ্ছন্ন ও শীতল।বাড়ির সামনে ঝিঙে কুমড়োর মাচান।বাড়ি থেকে আল পেরিয়ে রাস্তায় উঠতে হয়।পাশেই জলঢাকা নদী।নদী দক্ষিণে সরে এসার পর এখন এরা উত্তরে বাড়ি করে থাকে।নদীর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করে কোন লাভ নেই।নদীয়ালি মাছ বেশিক্ষণ রাখা যায় না।পছে জায়।সামান্য মাছ দূরে গিয়ে বেচতেও পারে না।কাছে পিঠে ক্রেতা নেই কারন সকলের বাড়ীতে জাল আছে।আর জাল মানেই মাছ।

কেদারনাথ গ্রামে গিয়ে তত্ত্বতালাশ করলে জানা যায় যে এই অসুর পরিবাররা কতদিন ধরে এখানে বসবাস করছে তা কারোরই জানা নেই।এরা নিজেরাও জানে না।কথাটা স্বীকার করলেন চুরু অসুর।চুরু অসুরের বাবা পারু,ঠাকুরদা মাকরা অসুরের জন্ম এখানেই।তবে তিনি বলেন যে তার পূর্বপুরুষেরা চা বাগানের কুলি হয়ে কোন এক সময় রাঁচি থেকে জলপাইগুড়ির আলিপুরদুয়ারে এসেছিলেন।দমনপুর চা বাগান থেকে পালিয়ে আসেন হাসিমারায়।সেখানে ঘরজামাই হয়ে বিয়েও করেন।তারপর তাদের কেউ কেউ চলে আসেন উত্তর খয়েরবাড়ীতে।আত্মীয় স্বজনেরা এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বিন্নাগুড়ি,হাসিমারা,দমনপুর ও উত্তর খয়েরবাড়ীতে।এরা কোথাও স্থির হয়ে বসবাস করেন না।কিন্তু কোচবিহার জেলার পাখিহাগায় এরা স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।চুরু অসুর জলপাইগুড়ি শহর দেখেছিলেন একবার।১৯৬৮ সালে বড় বন্যার সময় পলি সরিয়ে মৃতদেহ উদ্ধারের কাজে তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।টাকা পেয়েছিলেন।৭০ টাকা কামাই করে সেই বছর এক বিঘা জমি কিনেছিলেন চুরু অসুর।

**ধারাবাহিকটি পড়তে পরের সপ্তাহে চোখ রাখুন একবিংশর পাতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *