“আমরা অসুর জাতি—পুরোহিত মানি না”( পর্ব-৩)।উমেশ শর্মা

maxresdefaultবর্তমানে ভাত,রুটি এদের প্রধান খাদ্য।এরা খেতে ভালবাসে শুয়োর,খাসি, পাঁঠা, বক, ঘুঘু, বনমোরগ, খরগোস, হরিন। কিন্তু নানা কারনে এই খাদ্য তালিকার ভেতর অনেক খাবারই আজ পাওয়া সম্ভব নয়।মাংস কিনে খাবার সঙ্গতিও সকলের নেই।তবে এরা এখনও পর্যাপ্ত পরিমানে মাছ পেয়ে থাকেন। নদী থেকে জলাভুমি থেকে।আগের সময়ে যখন এদের পূর্বপুরুষেরা জঙ্গলে থাকতেন,তখন তারা জংলি পশু-পাখীর মাংস খেয়েই ক্ষুধা নিবারন করতেন।তবে এরা বছরের প্রথমে যে ফলমূল,শাক-সব্জি হাতের কাছে পান, সেই খাদ্য সামগ্রীকে পিতা-মাতা ও পূর্বপুরুষদের উৎসর্গ না করে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে না।এটা অসুর জাতির ঐতিহ্য,পরম্পরা।

আর্থিক সঙ্গতি নেই তাই পোষাক অপ্রতুল।ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা খালি গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।পুরুষদেরও খালি গা,পরনে গামছা জাতীয় কাপড়।প্রথম তিনটি বাড়ির মহিলারা এক কাপড়েই ছিলেন।কিন্তু ইন্দ্রের কুঠির পূর্ব প্রান্তে বাগবাড়ির অসুর পরিবারের মহিলাদের পোষাকে শালীনতার ছাপ স্পষ্ট।শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ পরে বেশ হাসিমুখে আলাপ করতে এল।ফ্রক পরা কিশোরী মনু অসুর এসে হাতে হাত মিলিয়ে সম্ভাষণ করলেন।বিবাহিত মহিলারা সিঁদুর পরে কিন্তু বিধবাদের কোন বৈধব্য সূচক পোশাক চোখে পড়েনি।তবে কোন অসুর রমণী সোনা বা রুপোর গহনা পরে না।সোনা রুপোর ব্যবহার অসুর সমাজে অচল,রিতি বিরুদ্ধ।এমনকি বিয়েতেও স্বর্ণালঙ্কার নিষিদ্ধ।

আগেই বলেছি যে পাখিহাগা স্কুল সংলগ্ন তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি ছেলে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে এবং একটি মেয়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত।বাগবাড়িতে এসে দেখা গেল কিশোরী মনু অসুর অষ্টম পর্যন্ত পড়ে পড়া ছেড়ে দিয়েছে।সমগ্র ইন্দ্রেরকুঠি গ্রামে ১৫ থেকে ১৬টি পরিবারের মধ্যে সবচাইতে উচ্চশিক্ষিত মন্টু অসুর,সে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে।মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারেনি।সে মাথাভাঙ্গা বিডিও অফিসের অধীনে শিকারপুর পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে পিয়ন পদে কর্মরত।এছাড়া কোন অসুর যুবক যুবতী সরকারী কিংবা আধা সরকারী অফিসে কাজ করে না।

অসুর সমাজে,এমনকি বৈদিক যুগে বর্ণভেদ প্রথা  ছিলনা।শাস্ত্রে,পুরানে এ বিষয়ে প্রচুর প্রমান পাওয়া যায়।বিষ্ণু পুরান(৪/৮)হরিবংশ(২৯)অগ্নিপুরান(২৮)প্রভৃতি শাস্ত্রেও একথা জানা যায়।চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় গৃহসমদের পুত্র সৌনকের চারপুত্র মধ্যে গুণ ও কর্ম অনুসারে ব্রাম্ভ্রন,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য ও শূদ্র হয়েছিলেন।ভারগভুমির চারপুত্র চারবর্ণে বিভক্ত হয়েছিলেন।ক্ষত্রিয় বৈবস্বত মনুর পৌত্র নিভাগ বৈশ্যত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন।ক্ষত্রিয়রাজ দুষ্মন্তের বংশধর গাগ্য,প্রিয়ংবদ মৌদগল্য গেত্রিয় ব্রাম্ভ্রন হয়েছিলেন।অসুরেরা প্রাক এরিয়ানযুগের মানুষ। তাদেরও কোন বর্ণভেদ ছিল না।আমাদের আলোচ্য অসুর সমাজেও বর্ণভেদ নেই।ওরাই ওদের ব্রাম্ভ্রন,ওরাই ওদের নাপিত।সর্বপেক্ষা বয়স্ক ব্যক্তিই বিয়ে,নামকরন,শ্রাদ্ধ ইত্যাদি কাজে ব্রাম্ভ্রন ও নাপিতের ক্রিয়াকর্ম করে থাকেন।

ব্রাম্ভ্রন বিরোধী এই জনগোষ্ঠী কোন হিন্দু দেব-দেবীর পুজো- অর্চনা করে না।দুর্গার মুখ দর্শন এদের কাছে ঘোর পাপ।কৃষ্ণ এদের দেবতা নয়। মহাদেবকে এরা মানেন কিন্তু ফুল,বেলপাতা ও দুধ কলা দিয়ে পুজো করে না।চৈত্র সংক্রান্তিতে সিরুয়া-বিজুয়ার সময় অসুরেরা কিছু আচার আচরণ পালন করেন বটে কিন্তু সে সব পুজোর পর্যায়ে পরে না।তবে এরা নবান্ন উৎসব পালন করে।নবান্ন পূর্বপুরুষকে প্রদান করে,বনের পশু-পাখিকে প্রদান করে।গাঁয়ের সবাই মিলে গারাম দেবতার থানে নবান্ন উৎসর্গ করে।কিন্তু সেটাও ব্রাম্ভ্রন্য রীতি রেওয়াজ মেনে পুজো নয়,নিজস্ব ভঙ্গিতে, ঐতিহ্য অনুসারে।কারোর বাড়িতে তুলসী মঞ্চ নেই। সন্ধ্যা প্রদিপের বালাই নেই।এরা বলে আমরা হিন্দু নই, আমরা অসুর।প্রতিটি উৎসবে মোরগ বা শুয়োর উৎসর্গ করেন এরা।

রান্নাঘরে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে পুজো করেন।পুজো শব্দটি প্রয়োগ করা হলেও পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে নিবেদিত মাত্র।গৃহিণী রান্না সমাধা করে এই থানে প্রয়াত চোদ্দপুরুষের নামে গৃহান্ন নিবেদন করবেন তারপর পরিবারের সকলে সে অন্ন ভোজন করবে।এটাই প্রতিদিনকার সেবা।এই থানটি বিবাহিতা মহিলারা দেখতে পাবেন না।জামাই দেখতে চাইলে সেই থান দেখতে পারে।এভাবে ঐতিহ্যকে নিত্যদিন স্মরন করার মত এতো বড় পুজো যারা করেন,হিন্দুধর্মে বর্ণভেদ প্রথার কারনে তাদেরকে অন্ততঃ অসুর বলে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না।রাখেনি ইন্দ্রকুঠির গ্রামের কিংবা কেদারহাট গ্রাম পঞ্চায়েতর সমাজও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *