আজ ‘ কাল’ এর কথা – অনির্বাণ ভট্টাচার্য

20cc40265a564c73001432fea2b59080--sacred-feminine-divine-feminine

বৈদিক সাহিত্যে মুণ্ডক উপনিষদে ‘কালী’ নামটি পাওয়া যায়।সেখানে যজ্ঞাগ্নির সপ্তজিহ্বার একটি নাম কালী।

 কালনাৎ সর্ব্বভূতানাং মহাকাল:প্রকীর্তিত 

 মহাকালস্য কালনাৎ ত্বমাবিদ্যা কালিকাপুরা

অর্থাৎ সর্বজীবকে যিনি কলন করেন তিনি হলেন মহাকাল।আর মহাকালকে যিনি গ্রাস করেন তিনিই কালী।কাল অনন্ত,তাই কালী অনন্ত শক্তি।শ্রী শ্রী চণ্ডীতে আছে দেবী পার্বতীর শরীর কোষ থেকে কৌশিকী দেবী নিঃসৃতা দেবী নিজে কৃষ্ণবর্ণা হয়ে যান।তখন তিনি পরিচিত হন কালিকা নামে।শুম্ভ নিশুম্ভের অনুচর চণ্ড এবং মুণ্ড অসুরদের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর মুখ তীব্র ক্ষোভে কৃষ্ণবর্ণ হয়ে যায়।তাঁর কপাল থেকে করাল বদনা দেবী কালীর উদ্ভব হয়।তিনি চণ্ড এবং মুণ্ডকে হত্যা করেন।তখন থেকে তাঁর নাম হয় চামুণ্ডা। মুখের ভ্রুকুটি থেকে ‘করালবদনা,বিনিশক্রান্তা সিপাসিনী খড়গ ধারা,পাশহন্তা কালী’ প্রকাশিত হন।দশমহাবিদ্যার দশটি ভয়াল রূপের মধ্যে প্রথমটিই কালী।তিনিই মূল প্রকৃতির সৃষ্টির উপাদান ও নিমিত্ত।বিবেকানন্দ বলে গেছেন শাক্তরা জগতের সেই সর্বব্যাপিণী শক্তিকে ‘মা’ বলে পুজো করে থাকে।কেননা ‘মা’নামের চেয়ে সুমিষ্ট নাম জগতে আর কিছু নেই।নারদ পঞ্চরত্নে বলা আছে, সতী দক্ষের প্রতি কূপিতা হয়ে দেহ ত্যাগ করেন।এরপর মেনকার প্রতি অনুগ্রহ করে তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহন করেন।নাম হয় কালী।কালিকা পুরাণে আছে, হিমালয় মাতঙ্গমুনির আশ্রমে দেবতারা মহামায়ার স্তব করছিলেন।সন্তুষ্ট হয়ে মহামায়া মাতঙ্গের পত্নীর রূপ ধরে দেবতাদের দর্শন দেন।এরপর দেবীর শরীর থেকে কালো কৃষ্ণবর্ণযুক্ত এক দিব্য নারী প্রকট হন।সেই নারী কাজলের মত কৃষ্ণবর্ণ ছিলেন বলে নাম হয় কালী।বৃহদ্ধর্ম পুরাণে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে কালীকে স্বাস্থ্যবতী,শ্যামবর্ণা, দিগম্বরী, পীনপয়োধরা ও মুক্তকেশী রূপে বর্ণণা করা হয়েছে।

কালী শব্দের ব্যুৎপত্তি হল ‘কাল+ঈ=কালী’।কালের ঈ শক্তি যুক্ত হয়ে কালী হয়েছেন।ঈ হলেন স্বগুণে ব্রহ্ম। তাই কালীই হলেন কালের উপলব্ধি হওয়ার শক্তি।কালকে গ্রাস করার জন্যই তিনি কালী।

বাণভট্টের কাদম্বরীতে ‘চামুণ্ডা’র কথা জানা যায়।সেখানে মূর্তির যে বর্ণনা রয়েছে তা হল,চতুর্ভূজা দেবী বিশ্বপ্রসবিনী।ডানদিকের উপরের হাতে রয়েছে অভয়মুদ্রা।বামদিকের উপরের হাতে খড়গ।ডানদিকের নীচের হাতে বরমুদ্রা।বাঁ দিকের নীচের হাতে রয়েছে কাটা মুণ্ড।কাটা মুণ্ডের কৃষ্ণকেশ দেবীর মুঠোয়।দেবীর শুভ্রদন্ত জিহ্বাকে দংশন করে রয়েছে।জিহ্বাতে আঁকিবুঁকি কাটা।দেবীর পদতলে শিব।এমন ভয়ঙ্কর রূপের কারণ হিসেবে কিছু কথা বলা যায়।মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে কৃষ্ণবর্ণা ভয়ঙ্করী এখানে উঠে এসেছে।প্রতিনিয়ত অশুভশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে নিজের শরীরে যে বিষের নির্যাস গ্রহন করেছেন,তাতেই তিনি এমন ঘোর কৃষ্ণবর্ণা, বীভৎস। তিনি তো কালের উর্দ্ধে,তাই এমন অকালদর্শী রূপ।খড়গ দিয়ে তিনি সমস্ত অজ্ঞানতার আঁধারকে দূর করছেন,তাই খড়গ এখানে জ্ঞানের প্রতীক।বরাভয় মুদ্রায় তিনি অভীষ্ট ফল দান করছেন।কাটা নরমুণ্ড দেবীর হাতে ধরা।অর্থাৎ তিনিই নরশক্তির চালিকা।নিয়ন্ত্রক।কোমর থেকে ঝোলা হাতগুলো ধূম্রলোচন নামক অসুর সেনাপতির ষাট হাজার সৈন্যের।এগুলি একেকটি লোভ,ক্রোধ,কামনা,বাসনা,মিথ্যা,মোহ,অহং এর প্রতীক।শিব পদতলে।কেননা শিব এখানে পুরুষ আর কালী প্রকৃতি।পুরুষ কেবল বীজ।সৃষ্টি।আর প্রকৃতি সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রক।নিয়ত নৃত্যশীলা।লীলাপরায়ণা।কালী যেমন শিবের অধীন,তেমনি শিবও কালীর অধীন।কাল অনন্ত।তাই কালীও অনন্ত শক্তি।জগৎ মাতার এই ভয়াল রূপের পিছনেই রয়েছে সৃষ্টির বীজ।সকল অন্ধকার মানবিক প্রবৃত্তিকে শোষণ করেছেন বলেই না তিনি ঘোর কৃষ্ণবর্ণা! মহানির্বাণ মন্ত্রে বলা হয়েছে তিনিই মহাকাল।তিনিই সর্বপ্রাণীকূলকে কলন এবং গ্রাস করেন।সেই মহাকাল কে দেবী একা হাতে দলন করে চলেছেন।ধ্বংস কে দলন করে সৃষ্টির নব নব বার্তা দিতেই দেবীর মর্ত্যে আগমন ও পুজো।

(চলবে….)

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *