আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া- অনির্বান ভট্টাচার্য

download (1)পুরাণমতে দোলের আগের দিন কাঠ জ্বালিয়ে ‘বহ্নুৎসব’ করার রেওয়াজ  বহুদিনের। বহ্নুৎসব, মদনদাহ বা কামদাহের সঙ্গে যুক্ত।যোগেশ চন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে বৈদিক যুগে এটি ছিল বর্ষ আরম্ভের ধর্মীয় উৎসব। তিনি আরও বলেন ৩১৯ খ্রিস্টাব্দে পৌষ সংক্রান্তিতে সূর্যের উত্তরায়ণ হত।তারও ছয় হাজার বছর আগে উত্তরায়ন পিছিয়ে হত ফাল্গুনী পূর্নিমা তিথিতে। উত্তরায়নে যাত্রাকাল থেকেই নববর্ষের সূচনা হত।সেকালে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে উত্তরায়নের শুরু বলে ধরা হত।গতির পরিবর্তন বা দোলন থেকেই ‘দোল’।দোলের আগের দিন আগুন জ্বালানোর এই ‘হোলাক’ বা ‘হোলক’ উৎসবের রীতিটা আর্যরা অনার্যদের কাছ থেকে পেয়েছিল।আর্যরাই নরবলির পরিবর্তে পশুবলির প্রচলন করে,সুশস্য উৎপাদনের জন্য আগুন জ্বালানোর আগে মেষ বা মেড়া বলি দিয়ে সেটাকে পোড়াত।এটাকেই ‘মেড়া-পোড়া'(ন্যাড়া পোড়া কথাটার উৎপত্তি হয়তো এখান থেকেই ) বলা হত।আর এটা হত চৈত্র মাসে।আলবিরুনীর লেখাতে এই অনুষ্ঠানের সময় কাল চৈত্র মাস বলে উল্লিখিত আছে।গরুর পুরানেও সেই একই সময়ের কথা আছে।

২২ ডিসেম্বর এরপর থেকে শুরু হয় সূর্যের উত্তরায়ণ। অয়ন শব্দের অর্থ গমন বা যাত্রা।গতির পরিবর্তন বা দোলন থেকেই দোল।দোলের প্রধান অধিদেবতা ছিলেন বিষ্ণু।পরে এই প্রথায় কৃষ্ণের প্রবেশ ঘটে।দেবতা যখন নিজের আসন ছেড়ে অন্যত্র যাত্রা করে পুজো গ্রহন করেন তখনই সেটাকে বলে ‘যাত্রা’ বা ‘গমন’।অন্য অর্থে ‘অয়ন’।সূর্যের গমন পথের পরিবর্তন বা যাত্রা রূপকার্থে ‘দোলন’ বা ‘দোল যাত্রা’। আর্য ঋষিরা বাস করতেন সিন্ধু উপত্যকায়,পঞ্জাব অঞ্চলে।শীতকালে যেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা।তারা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিল উত্তরায়ণ যেদিন শুরু হত সেদিন দিন থাকে দশ ঘন্টার আর রাত চোদ্দ ঘন্টার।সূর্য্য যত উত্তরে সরে(আপাত গতির কারণে)ততই দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ে,আলো বাড়ে,তাপ বাড়ে।প্রকৃতিও যেন নতুন প্রাণ পেয়ে জেগে ওঠে।জড়তা কাটে জীবকূলের।ঋগ্বেদীয় ঋষিরা এই হিম(শীত)কাটাতে তারা আয়োজন করত হোম(যজ্ঞ)এর।সুর্য্য চলাচলের পথে আসতো “ফাল্গুন”।দোল পৌর্ণমাসী বা দোল পূর্ণিমায় বিষ্ণুবিগ্রহের সিংহাসন উত্তর-দক্ষিনে দোলানো হত,উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নকে মনে রেখে,যেহেতু সেসময়ে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকেই উত্তরায়নের শুরু বলে ধরা হত।জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে ভদ্রপদা নক্ষত্রকে অতিক্রম করেই সূর্যকে উত্তরায়নের পথে যাত্রা করতে হয়।অনেক সময় এই নক্ষত্র বিলম্বে উদিত হলে উত্তরায়নেও বিলম্ব ঘটতো।এই নক্ষত্রকে কোথাও কোথাও অজৈকপাদ(অজ+একপাদ) নক্ষত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে।যার অর্থ এক পা বিশিষ্ট ভেড়া।উত্তরায়নের পথে এগোতে গেলে সূর্য্যকে এক পা বিশিষ্ট মেষরূপী অসুরকে বধ করে এগোতে হয়।সমাজতাত্ত্বিক নির্মল বসুর মতে,এর পিছনে একটা বিজ্ঞানভিত্তিক কারণও আছে। জীবরক্তে জমির উর্বরতা বাড়ে।তাই পশুবলি।গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের বাসন্তিক আবহে ক্রমবর্ধমান মানবিক ও জৈবিক কামনা বাসনাকে শৃঙ্খলিত করতে এই প্রথাটাকে চালু করা হয়।কবি ভারতচন্দ্র পর্যন্ত এই সময়কে মনে করে লিখেছেন “বারমাস মধ্যে মাস বিষম ফাল্গুন/মলয় পবন জ্বালে বিরহ আগুন”। স্কন্দপুরাণে আছে মহর্ষি কাশ্যপের মহিষী দিতির গর্ভে মনুর মানস পুত্র হিরণ্যকশিপু এবং কন্যা হোলিকা জন্মায়।হিরণ্য নর ও সুর(দেবতা)এর অবধ্য ছিল।হোলিকা ছিল অনলজয়ী(আগুনে অবধ্য)।বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে আগুনে পোড়াতে গিয়ে হোলিকা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই থেকেই হোলিকা রাক্ষসীর কথা জানা যায়।হিন্দীতে সেখান থেকেই “হোলিকা দাহ” বা “হোলি জ্বালানা” কথাটা এসেছে। সেখানে এই অনুষ্ঠানকে বলে ‘সংবৎ জ্বালানো’ বাংলায় বুড়ির ঘর জ্বালানো। ক্রোনোলজি অফ এনসেন্ট ইন্ডিয়া গ্রন্থে ভেন্দলাই গোপাল আইয়ার বলেন ‘হোলি’নামটি এসেছে ‘হোলিকা’ রাক্ষসীর নাম থেকে।অগ্নির লেলিহান শিখায় শুখনো কাটকুটো,পাতা ইত্যাদি ‘চর চর’ করে পুড়ে যেতে থাকে।বাতাসে ঘুরপাক খাওয়া এই শব্দকে সংস্কৃতে “চর্চরী”বলে।তা থেকেই এসেছে ‘চাঁচর’ কথাটি।পুরাণ বর্ণিত বহ্নুউৎসবকে তাই “চাঁচর উৎসব” বলা হয়েছে।পশুবলি,তার খণ্ডিত দেহ নিঃসৃত রক্ত জমিতে মেশা,শুখনো ডালপালায় আগুন ধরিয়ে ছাই উৎপাদন,লেলিহান অগ্নিশিখায় ভুজ্যিস্বরূপ কলাটা,মুলোটা,আলুটা চড়িয়ে এই উর্বরতা কেন্দ্রিক লোকরঞ্জনী ক্রীড়া কৌতুক,আদিম স্থানান্তরিত কৃষি ব্যবস্থার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পোড়া ছাই জমিতে ছড়িয়ে দেওয়া “স্ল্যাশ এন্ড বার্ন” পদ্ধতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়,যা ঝুম চাষ পদ্ধতিরই একটা ধাপ।

অনির্বান ভট্টাচার্য

অনির্বান ভট্টাচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *