আজও সরকারি নথিতে ভগত সিং শহীদ নয়। দেবাশীষ পাইন

imagesভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম উজ্জল নক্ষত্র ভগত সিং।ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন ভগত সিং।১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে মাত্র ২৩ বছর বয়সে রাজগুরু, সুখদেব ও ভগত সিংয়ের ফাঁসি হয়।

কয়েক বছর আগে ভগত সিংয়ের নাতি যাদবেন্দ্র সিং তথ্য জানার অধিকার আইনে জানতে চান যে কবে ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে শহীদ স্বীকৃতি দেওয়া হবে! খবরটি পাওয়ার পর রীতিমতো আঁতকে উঠেছিলাম। কারন ১৯৩১ সালের পর থেকে সমগ্র  ভারতবাসী যে বিপ্লবী  ত্রয়ীকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে এসেছে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কোথায়। তথ্য জানার অধিকার আইনের কি প্রয়োজন পড়লো।  ঘটনাটা অবাক করে দেওয়ার মতো হলেও- সত্য।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাষে  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ভগত সিংযের নাতি যাদবেন্দ্র সিংকে জানায়, ভগত সিং যে শহীদ হয়েছিলেন সেই রকম কোনও প্রমান খাতায় কলমে সরকারি নথিতে নেই। তাই তাকে শহীদ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। হা ঈশ্বর- এ কোন দেশে আমরা বাস করি!

উনিশ শতকের শেষের দিকে মধ্য পাঞ্জাবের কিছু লোক উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে চলে আসে। প্রচুর পরিশ্রমী এই জাঠ মানুষগুলি বাঞ্জার জমিকে চাষযোগ্য করে তোলে। ভগত সিংযের পরিবারও ছিল এই দলে। ঠাকুরদাদা অর্জুন সিংহ দয়ানন্দ সরস্বতীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।বাবা সর্দার কিষাণ সিংহ ছিলেন একজন মানবপ্রেমিক মানুষ। ছোটকাকা স্বর্ণ সিং বিপ্লবী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অপরাধে দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। যে কারণে মাত্র ২৩ বছর বয়সে মারা যান।মেজকাকা অজিত সিং আরেক বিপ্লবী। তিনি লালা লাজপত রায়ের খুব কাছের লোক ছিলেন। অজিত সিং পাঞ্জাবে ‘ভারত দেশপ্রেমিক সমিতি’ গড়ে তুলে বিপ্লবী কার্যক্রম শুরু করেন। তাদের পুরো পরিবারই ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।এমন পরিবার ভগত সিংযের জন্ম দেবে নাতো আর কে দেবে?

পাঞ্জাবের লায়লাপুর জেলার বাংগা গ্রাম থেকে জালিয়ানওয়ালাবাগ প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার। ১২ বছরের কিশোর ভগতকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।সকালে স্কুলে যাওয়ার নাম করে বেরিয়েছে। পরিবার স্কুলে খবর নিয়ে জানল ভগত আজ স্কুলে আসেনি।তাহলে ভগত গেল কোথায়? আতঙ্কে পরিবারের সকলে ছুটাছুটি করছে। অনেক রাতে ধূলিধূসর হয়ে ভগত বাড়ি ফিরল। পরিবারের সকলের একটাই জিজ্ঞাসা- কোথায় ছিলি? অশ্রুভেজা নয়নে ভগত কামিজের পকেট থেকে ন্যাকড়ায় মোড়া এক খাবলা মাটি বার করল। কীসের মাটি। ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল ব্রিগেডিয়ার ডায়ারের নির্দেশে ১০০ জন গুর্খা সৈন্য আর ২টি  সাঁজোয়া গাড়ি  যে ২০০০ মানুষকে হত্যা করেছিল সেই শত শহীদের রক্ত মাখা মাটি ভগতের হাতে।

১৯২১ সালে গান্ধীজী  চিত্তরঞ্জন দাসের মাধ্যমে সব বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করতে অনুরোধ করেন। কিশোর ভগত সিংও আন্দোলনে যুক্ত হন। নিজের গ্রামে সহপাটিদের নিয়ে বিলাতি দ্রব্য পোড়াতে শুরু করে।১৯২২ সালে ৫ই ফেব্রুয়ারি  চৌরিচৌরায় কৃষকদের ওপর গুলি চললে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ জনতা থানা ঘেরাও করে জ্বালিয়ে দেয়। তাতে ২২ জন পুলিশ মারা যায়। এই ঘটনার পর গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান।

অসহযোগ আন্দোলন থেমে যেতে ভগত সিং শিখ গুরুদ্বার সংস্কারের কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। মাথায় বড় চুল রেখে, পাগড়ি পরে, কোমরে কৃপাণ গুঁজে লেগে পড়লেন পুরোহিতদের বিরুদ্ধে। বললেন- ভক্তের টাকায় চলা গুরুদ্বারে পুরোহিতদের ব্যক্তিগত ভোগবিলাস বন্ধ করতে হবে। এবার থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আয় ব্যায়ের হিসাব রাখবে। ভগত মহাপাপ করছে এমন বোঝাতে শুরু করে বয়স্করা কিন্তু অল্প বয়স থেকে মার্কসবাদ পড়া ভগত কোনও বাধার কাছে নতিস্বিকার করেনি। ‘আমি কেন নাস্তিক’  নিজের বইতে ভগত লিখেছেন- ঈশ্বরে আমার অটল বিশ্বাস কিন্তু ধর্মীয় মতবাদ ও পৌরাণিক কাহিনিতে আমার কোন আস্থা নেই।

১৯২৩ সালে ভগৎ সিং বিপ্লবী নেতা শচীন সান্যালের পরামর্শে ভগৎ সিং হিন্দুস্থান রিপাবলিকান এসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৪ সালে ভারতজুড়ে শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র  আন্দোলন।চট্টগ্রামে রেলওয়ে ডাকাতি,বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক ডাকাতি ও বিপ্লবীদের সশস্ত্র কার্যকলাপের কারণে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে ব্রিটিশ ‘১ নং বেঙ্গল অর্ডিনান্স’ নামে এক জরুরি আইন পাশ করে। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল, ‘রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য সন্দেহভাজনদের বিনা বিচারে আটক রাখা’।

১৯২৫ সালের ৯ আগষ্ট। উত্তর প্রদেশের কাকোরী রেল স্টেশনে সরকারী টাকা ডাকাতি করলো ১৪/১৫ জন সশস্ত্র যুবক।যাওয়ার সময় ডাকাত দল বলে গেল ইংরেজ আমাদের দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছিল তাই আমরা সেই টাকা উদ্ধার করে দেশের কাজের জন্য নিয়ে গেলাম।’কাকোরী ষড়যন্ত্র মামলায়’ ৪৪ জনকে গ্রেফতার করে। মামলায় রাজেন লাহিড়ী, ঠাকুর রোশন সেন, আসফাকুল্লা খান এবং রামপ্রসাদ বিসমিল্লার ফাঁসি হয় ও গণেশ শঙ্কর, শচীন সান্যালসহ ১৪ জনকে আন্দামানে পাঠানো হয়।

এই ঘটনার পর দলের নির্দেশে ভগৎ সিং কানপুর থেকে পাঞ্জাবে চলে আসেন এবং সহযোদ্ধাদের নিয়ে ‘নওজোয়ান ভারতসভা’ নামে একটি দল গঠন করেন। এই দলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে দিনমজুর ও কিষাণদের এক করে সশস্ত্র বিপ্লবের সপক্ষে নিয়ে যাওয়া।

১৯২৮ সালের ৩০ অক্টোবর লাহোরে লালা লাজপত রায়ের নেতৃত্বে একটি নীরব অহিংস পথযাত্রার উপর পুলিশ লাঠি চার্জ করে। লালা লাজপত রায় পুলিশের নৃশংস লাঠি চার্জে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান। ভগৎ সিং এই  এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। ভগৎ সিং, রাজগুরু, সুখদেব ও জয় গোপাল একত্রে পুলিশ প্রধান স্কটকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। সনাক্তে ভুল হওয়ায় স্কটের বদলে সান্ডারস গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। সামান্য ভুলের কারণে বেঁচে যান। ভগৎ সিং আত্মগোপনে চলে যায়। চুল-দাঁড়ি কেটে ফেলেন। কিছু দিন পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। এখানে এসে বাংলার বিপ্লবী যতীন দাসের মাধ্যমে একটি হোস্টেলে আস্থানা গাড়ের।

অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদেরকে দমনের জন্য পুলিশকে অধিক ক্ষমতা প্রদান করে ভারত প্রতিরক্ষা আইন পাশ করার সমস্ত প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করে। ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে আইনটির পাশ হবার সিদ্ধান্ত হয়। এই আইনকে রুখে দেওয়ার জন্য ভগৎ সিং এর ‘হিন্দুস্থান সোসালিস্ট রিপাবলিকান এসোসিয়েশন’ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। দলের নেতা ভগৎ সিং এর নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত হয় ৮ এপ্রিল সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত বোমা নিক্ষেপ করবেন। ৮ এপ্রিল ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর বোমা নিক্ষেপ করে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান দেন। বোমা নিক্ষেপের পর কেউ পলায়নের চেষ্টা করেনি। পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে।

মামলায় ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত উভয়েই যাবজ্জীবন দীপান্তর দণ্ডে দণ্ডিত হন। কিন্তু তাঁদের দু’জনকে পুলিশ ইনসপেক্টর সান্ডার্সকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। এই মামলায় প্রমাণাভাবে বটুকেশ্বর দত্ত অব্যাহতি পান। কিন্তু ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুকে খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে প্রেরণ করা হয়।

জেলে বন্দী থাকাকালে ভগৎ সিং ব্রিটিশ ও ভারতীয় বন্দীদের সমানাধিকারের দাবিতে ৬৩ দিন অনশন করেন। সে সময় ভারতীয় বন্দীদের চেয়ে ব্রিটিশ চোর ও খুনিদের সঙ্গে ভাল আচরণ করা হত। ৬৩ দিন অনশনের ফলে ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ভগৎ সিং জেলে থাকার সময় ডায়রী লিখতেন। ১৯৩০-৩১ সালে জেলের মধ্যে ফাঁসির অপেক্ষায় যখন ভগৎ সিং এর দিন কাটছিল সে সময় তিনি ‘why I am An Atheist’ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। ফাঁসির কয়েক মাস পরে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।

১৯৩০ সালের ৭ অক্টোবর। তিন ব্রিটিশ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুকে অপরাধী সাব্যস্ত করে এবং ফাঁসির হুকুম দেওয়া হয়। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ সন্ধ্যা ৭ টায় এই তিন বিপ্লবীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এর পরেও ভগত সিং, সুখদেব ও রাজগুরুরা সরকারি নথিতে শহীদের মর্যাদা পায় না।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *