“অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি”, লিখেছেন- সৌম্য আইচ রায়

avgGGBM_700bদুনিয়ায় ভাষা ক’টি?
দ্য লিঙ্গুইস্টিক সোসাইটি অফ আমেরিকার হিসেবে সংখ্যাটা ৬৮০০-র ধারেপাশে। সামার ইনস্টিটিউট অফ লিঙ্গুইস্টিকসের এথনোলগ বলছে, সংখ্যাটা ৭১০০-রও বেশি।
মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছে বিভিন্ন দেশে। কিন্তু ক’টি ভাষার মানুষ নিজের মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে শহিদ হয়েছেন?
ইতিহাসের বইপত্তর, গুগলে তন্নতন্ন করে খুঁজে মিলছে একটি ভাষার নাম। বাংলা। একবার নয়, একাধিকবার। একবার তো সে আন্দোলনের ধাক্কায় শেষ পর্যন্ত নতুন একটা দেশেরই জন্ম হয়ে গেল।
আশপাশে অনেককেই বলতে শুনি, বাঙালি আর মুসলমান। অর্থাৎ হিন্দু বোঝাতে বলা হয় বাঙালি। মজার ব্যাপার হল, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলন করতে গিয়ে প্রথম যাঁরা শহিদ হয়েছেন, ধর্মের বিচারে তাঁরা সবাই মুসলমান—আব্দুল জব্বার, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালাম, আবুল বরকত-সহ আরও অনেক ছাত্র। নিহত হয় ৯ বছরের অহিউল্লাহ।

বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন
সেটা ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। শুরুটা অবশ্য হয়েছিল বছর পাঁচেক আগে, দেশভাগের পরেই। আজকের বাংলাদেশের নাম তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান। নবগঠিত পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে বাংলাভাষী ছিলেন ৪ কোটি ৪০ লক্ষ। তবু উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা শুরু হয় ১৯৪৭ থেকেই। পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদও শুরু হয়ে যায় সে বছর থেকেই। পাক সংসদেও প্রতিবাদ হয়।  উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে।’ পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ আন্দোলন, সরকারের দমন-পীড়ন চলতেই থাকে। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনও ভাষা নয়।’ প্রতিবাদ আরও তীব্র হয়। নানা টানাপোড়েন চলতে থাকে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে জনসভায় জিন্নাহর সুরে সুর মিলিয়েই ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। সেদিনই ছাত্র-সহ নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় মিলিত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতালের সিদ্ধান্ত নেন। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে।
অবশেষে ২১ ফেব্রুয়ারি। সকাল ৯টা থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জড়ো হয়। বেলা সওয়া ১১টা নাগাদ ছাত্ররা রাস্তায় নামার চেষ্টা করে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে।  উপাচার্য পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে না বলে ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ছাড়ার নির্দেশ দেন। ছাত্ররা ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় পুলিশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করতেই অশান্তি শুরু হয়। কিছু ছাত্র আইনসভায় গিয়ে তাদের দাবি তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। বেলা ৩টে নাগাদ ছাত্ররা আইনসভার দিকে রওনা হতেই পুলিশ ছাত্রাবাসে গুলিবর্ষণ শুরু করে। তার জেরেই একের পর এক মৃত্যু।
অবশেষে বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। তবে সেখানেই থামেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মে চূড়ান্ত পরিণতি পায় ভাষা আন্দোলন।

sohid

অসমে ভাষা আন্দোলন
দ্বিতীয় ঘটনাটি অসমের। ১৯৬০ সালের এপ্রিলে, অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র ভাষা হিসেবে ঘোষণার কথা বলে। তার জেরে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমিয়া-বাঙালি সংঘর্ষ শুরু হয়। অনেক বাঙালি রাজ্য ছেড়ে পালান। অসংখ্য বাড়ি ভেঙে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ৯ জন বাঙালিকে খুন করা হয়। ১০ অক্টোবর, ১৯৬০ সালের অসমের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমল প্রসাদ চলিহা বিধানসভায় অসমিয়াকে অসমের একমাত্র সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ২৪ অক্টোবর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রতিবাদে ১৯৬১-এর ৫ ফেব্রুয়ারি তৈরি হয় কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ। প্রচার, আন্দোলনের পরও সরকার সিদ্ধান্ত বদল না করায় ১৯ মে হরতালের ডাক দেওয়া হয়। শুরু হয় গ্রেফতারি, আধা সামরিক বাহিনীর ফ্ল্যাগ মার্চ।
১৯ মে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হরতালের সঙ্গে শুরু হয় পিকেটিং। দুপুরে কাটিগোরা থেকে ৯ জনকে গ্রেফতার করে নিয়ে জাওয়ার সময় তারাপুর স্টেশনের কাছে পুলিশের ট্রাক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আধা সামরিক বাহিনী ১৭ রাউন্ড গুলি চালায়। সব মিলিয়ে নিহত হন ১১ জন—কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকমল পুরকায়স্থ ও কমলা ভট্টাচার্য।
শেষ পর্যন্ত অসম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
তারপরেও অবশ্য ১৯৭২ সালের ১৭ অগাস্ট বিজন চক্রবর্তী এবং ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস বাংলাভাষার জন্য লড়াইয়ে শহিদ হন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি
১৯৯৮ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব কোফি আন্নানের কাছে ২১ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  ঘোষণার আবেদন জানান। ১৯৯৯-র ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশন দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি রাষ্ট্রসংঘের সদস্য দেশগুলিতে তা পালন শুরু হয়। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

সৌম্য আইচ রায়

সৌম্য আইচ রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *