অমর শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার অমর রহে।

Original_Archived_photo_of_Pritilata_Waddedarআমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অবদান অবদান অপরিসীম।এই নারী বিরাঙ্গনারা যেমন অষ্টাদশ শতকের শেষভাগের কৃষক আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহন করেছিল, তেমনি অগ্নিযুগের বিপ্লবী আন্দোলনেও।ননীবালা, দুকড়িবালা, ইন্দুমতী দেবী, ধলঘাটের সাবিত্রী দেবী ইত্যাদি নামের সরণি শেষ হওয়ার নয়। বীরকন্যা প্রীতিলতাও এদের পদাঙ্ক অনুসরন করেছিল।

প্রীতিলতা মাস্টারদা সূর্যসেনের ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির, চট্টগ্রাম শাখার একমাত্র নারী সেনানি ছিলেন।মাত্র ২১ বছর বয়সে দেশের জন্য প্রান দিয়েছিলেন।

১৯২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস। সন্ধ্যার সময় ভাই বোনেরা একসঙ্গে পড়তে বসেছে। শুধু প্রীতিলতার বড়দা মধুসূদন আনমনা হয়ে বসে আছে। মধুসূদন বোনের মুখের দিক তাকিয়ে হটাত করে বললেন, ‘আজ রেল শ্রমিক কর্মচারীদের বিপুল অঙ্কের বেতনের টাকা নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে ব্রিটিশ পুলিশরা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।সেইদিন সকালবেলা বড় রাস্তার ধারে চারজন লোক পিস্তল দেখিয়ে সব টাকা লুট করে নেয়। ওই লোকগুলো কেউই ডাকাত নয়, স্বদেশী।এরা মৃত্যুর পরোয়া করে না,দেশের স্বাধীনতাই এদের একমাত্র লক্ষ। এই ঘটনা প্রীতিলতাকে দারুণভাবে নাড়া দেয়।

ঘটনার এক মাস পর, একদিন ঐ স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের আস্তানায় ব্রিটিশ পুলিশ হামলা চালায়। দুদলের মধ্যে তুমুল বন্দুকযুদ্ধের পর পুলিশ দুজন স্বদেশীকে গ্রেফতার করে। সূর্যসেন ও অম্বিকা চক্রবর্তী আহত হয়। আহত এই দুজন স্বদেশীকে দেখার পর প্রীতিলতার অন্তরে ইংরেজের বিরুদ্ধে আগুন জ্বলে ওঠে।

প্রীতিলতা ১৯২৭ সালে মেট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। থাকতেন কলেজের ছাত্রীনিবাসে। এ সময় প্রীতিলতা বিপ্লবী লীলা নাগের সংস্পর্শে আসেন। তখন বিপ্লবী লীলা নাগের নেতৃত্বে ‘দীপালী সংঘ’ সংগঠনটি পরিচালিত হতো। দীপালী সংঘ ছিল ‘শ্রীসংঘর মহিলা শাখা সংগঠন। ‘শ্রীসংঘ’ ছিল তখনকার ঢাকার একটি বিপ্লবী দল। প্রীতিলতা এই সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসাবে কাজ শুরু করে দেন।

১৯২৯ সাল। তখন সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক। পূর্ণেন্দু দস্তিদার প্রীতিলতাকে বিপ্লবীদের গোপন বৈঠকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রন জানায়।বৈঠকের পর সূর্য সেন প্রীতিলতাকে আলাদাভাবে দেখা করতে বলেন। হলেন।

Pritilata_Shohid_Minar আইএ পরীক্ষার পর প্রীতিলতা বেথুন কলেজে ভর্তি হন। থাকা শুরু করেন কলেজের ছাত্রীনিবাসে। মাস্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতা ছাত্রীনিবাসে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু করে দেয়। গড়ে তুললেন এক বিপ্লবী চক্র। এই বিপ্লবী চক্রে অনেক মেয়ে সদস্য যোগ দিলেন। তাঁদের মূল কাজই হলো অর্থ সংগ্রহ। অর্থ সংগ্রহ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে পাঠাতে লাগলেন। কলকাতার এক গোপন কারখানায় তখন তৈরি হয় বোমার খোল। মাস্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী সেই বোমার খোল সংগ্রহ করত প্রীতিলতা।

১৯২৯ সালে পূজার ছুটিতে কল্পনা দত্ত, সরোজিনি পাল, নলিনী পাল, কুমুদিনীকে নিয়ে প্রীতিলতা চট্টগ্রাম আসেন। বোমার খোলগুলো পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের হাতে। মাস্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী প্রীতিলতা এরপর প্রকাশ্য বিপ্লবী কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। কলকাতায় যে বিপ্লবী চক্র গঠন করা হয়েছে, তাঁদের সব ধরনের প্রশিক্ষণও প্রীতিলতাকে দিতে হতো।

চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার দখল, জালালাবাদ সংঘর্ষ  এবং সেই যুদ্ধে তাঁর আত্মীয় শহীদ হওয়া, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির পর থেকে প্রীতিলতা চট্টগ্রাম ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মহানায়ক সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম দখল হলো। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন বিকল, সরকারি অস্ত্রাগার লুঠ করা হয়েছে, রিজার্ভ পুলিশ ছত্রভঙ্গ ও রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে। স্বদেশী বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম শহর দখল করে ফেলেছে। এ সময় প্রীতিলতা কলকাতায়। সশস্ত্র বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার জন্য বারংবার মাস্টারদার অনুমতি চাইছেন কিন্তু মেলেনি।

১৯৩২ সালের মে মাসে প্রীতিলতার জন্মস্থান ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে মাস্টারদা তাঁর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করছিলেন। ঐ বৈঠক চলার সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা হানা দিলে বিপ্লবীদের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে প্রাণ দেন নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্যসেন কোনরকমে প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার জলে লুকিয়ে থাকেন।

এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার প্রীতিলতাকে সন্দেহ করা শুরু করে। মাস্টারদার নির্দেশে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের অভিযান ব্যর্থ হয়। মাস্টারদা প্রীতিলতাকে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে বলেন। কাট্টলি সমুদ্রসৈকতে বিপ্লবী দলকে মাস্টারদা সামরিক প্রশিক্ষণ দেন।

প্রশিক্ষণ শেষে প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে এবং সফল হন। আক্রমণ শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। প্রীতিলতা আহত অবস্থায় ধরা পড়তে চাননি তাই সঙ্গে রাখা সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এভাবে দেশের জন্য আত্মাহুতি দেন।

অমর শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার অমর রহে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *